প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মার্কিন বাহিনীর পরিচালিত এক অভিযানে অন্তত ১০০ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে দেশটির সরকার। আহত হয়েছেন আরও কয়েক ডজন মানুষ। ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলোর বরাতে এই তথ্য সামনে এসেছে, যা দেশটিতে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সরকারের দাবি অনুযায়ী, অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো, যাকে আটক করার উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাবেলো বলেন, এই হামলা ছিল ভয়াবহ ও নজিরবিহীন। তাঁর ভাষায়, “এ পর্যন্ত, আমি আবার বলছি, এ পর্যন্ত ১০০ জন নিহত এবং প্রায় একই সংখ্যক মানুষ আহত হয়েছেন।” তিনি বলেন, রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংঘটিত এই অভিযানে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে, যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
কাবেলোর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও আহত হন। তবে বর্তমানে তারা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন বলে জানানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, এটি শুধু একটি নিরাপত্তা অভিযান ছিল না, বরং ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত। তিনি বলেন, “আমাদের দেশের ওপর এই হামলা পরিকল্পিত এবং ভয়াবহ ছিল।”
সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এই অভিযানের পর দেশজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর টহল বাড়ানো হয়েছে। সরকারি ভবন, কূটনৈতিক মিশন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা বাড়াতে জরুরি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে জনগণকে শান্ত থাকার এবং গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, অভিযানের সময় ব্যাপক গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দে রাজধানীর বহু এলাকা কেঁপে ওঠে। আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে যান অনেক মানুষ। হাসপাতালগুলোতে আহতদের ভিড় তৈরি হয়, জরুরি বিভাগগুলোতে দেখা দেয় রক্ত ও ওষুধের সংকট। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ ও বিস্ফোরণে গুরুতর জখম হয়েছেন।
এই ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও মার্কিন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি, তবে ভেনেজুয়েলার সরকার এই হামলার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে। প্রেসিডেন্ট মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মহল এটিকে “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ” হিসেবে অভিহিত করেছে এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা দেশটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করতে পারে। একদিকে অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে থাকা ভেনেজুয়েলা এখন আরও বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি দেশটিকে আরও সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাবেলো তাঁর বক্তব্যে বলেন, ভেনেজুয়েলা কোনো বিদেশি শক্তির চাপের কাছে মাথানত করবে না। তিনি দাবি করেন, দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে এই হামলার জবাব দেবে এবং সরকারকে সমর্থন করবে। তাঁর ভাষায়, “আমরা শান্তি চাই, কিন্তু আমাদের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপস করব না।”
এদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি জানায়, এই অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক নতুন করে উত্তেজনার মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত শীতল। অতীতে ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে, আর বর্তমান ঘটনাকে সেই ধারাবাহিকতারই অংশ হিসেবে দেখছে কারাকাস।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে আরও বলা হয়, অভিযানের পর প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়। তিনি জানান, দুজনই বর্তমানে স্থিতিশীল অবস্থায় আছেন। যদিও এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নানা ধরনের তথ্য ও ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, সরকার সেগুলোর অনেককেই বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করছে।
চলতি সপ্তাহে নিউইয়র্কের একটি আদালতে হাজির করার সময় মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিজের পায়ে হেঁটে চলাচল করতে দেখা গেছে—এমন তথ্যও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। তবে এই বিষয়টি নিয়ে ভেনেজুয়েলার সরকার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তথ্য ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে। রাজধানীর বেসামরিক এলাকায় সংঘটিত এই ধরনের অভিযানে সাধারণ নাগরিকদের প্রাণহানি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন কি না—সে প্রশ্ন তুলেছেন অধিকারকর্মীরা। তারা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এবং নিহত ও আহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার জনগণ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। দোকানপাট বন্ধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থগিত এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। রাজধানীর রাস্তায় আতঙ্ক আর শঙ্কার ছায়া স্পষ্ট। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে দেশটি আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, কারাকাসে কথিত এই মার্কিন হামলা ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন ও ভয়াবহ অধ্যায় যোগ করেছে। নিহত শতাধিক মানুষ, আহত অসংখ্য নাগরিক এবং রাষ্ট্রপ্রধানকে লক্ষ্য করে পরিচালিত অভিযানের অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক জটিল অধ্যায়ে রূপ নিচ্ছে। এই পরিস্থিতির পরিণতি কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়; তবে একথা নিশ্চিত, ভেনেজুয়েলা ও বিশ্ব রাজনীতিতে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।