শহীদ হাদি ও নজরুলের কবর জিয়ারতে জকসুর নবনির্বাচিতরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৬ বার
শহীদ হাদি ও নজরুলের কবর জিয়ারতে জকসুর নবনির্বাচিতরা

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচনে সদ্য বিজয়ী প্রতিনিধিরা দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ইতিহাস, সংগ্রাম ও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতীক হয়ে ওঠা দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্নে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের শহীদ শরীফ ওসমান হাদী এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করার পাশাপাশি শিক্ষার্থী রাজনীতিতে মূল্যবোধভিত্তিক ধারার প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে অবস্থিত শহীদ হাদী ও কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবর প্রাঙ্গণে জকসুর নবনির্বাচিত নেতারা একত্রিত হন। শীতের সন্ধ্যার নীরবতায় কবর প্রাঙ্গণে উপস্থিত শিক্ষার্থী নেতাদের চোখেমুখে ছিল আবেগ, শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতার ছাপ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, তারা অত্যন্ত সংযত ও শালীন পরিবেশে কবর জিয়ারত ও দোয়া-মোনাজাতে অংশ নেন।

প্রথমে তারা শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর কবর জিয়ারত করেন। সেখানে সংক্ষিপ্ত দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়, যেখানে শহীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করা হয় এবং একই সঙ্গে তার আত্মত্যাগ থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। শহীদ হাদী আধিপত্যবাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিচার না হওয়ায় শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলে যে ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে, সেটিও এই দোয়া মাহফিলের আলোচনায় উঠে আসে।

শহীদ হাদীর কবর জিয়ারত শেষে জকসুর নেতারা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবর প্রাঙ্গণে যান। সেখানে তারা বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন এবং কবির আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। নজরুল ইসলাম কেবল বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি নন, বরং তিনি সাম্রাজ্যবাদ, অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক চিরন্তন প্রতিবাদের নাম। শিক্ষার্থী রাজনীতিতে যুক্ত তরুণ নেতৃত্বের কাছে নজরুলের আদর্শ যে এখনো প্রাসঙ্গিক, এই কবর জিয়ারত তারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সহসভাপতি (ভিপি) রিয়াজুল ইসলামের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই মোনাজাতে জকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস), সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস)সহ নির্বাচনে বিজয়ী অন্যান্য প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক সাদিক কায়েমের উপস্থিতি এই কর্মসূচিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। এতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী রাজনীতির প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র ফুটে ওঠে।

কবর জিয়ারত শেষে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় ভিপি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, জকসু নির্বাচনে বিজয়ের পর শহীদ হাদীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো তাদের নৈতিক দায়িত্ব। তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষার্থী রাজনীতি কেবল ক্ষমতা বা পদ-পদবির বিষয় নয়; এটি ন্যায়, সত্য ও ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ থাকার নাম। তার ভাষায়, শহীদ হাদীর মতো মানুষের আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়।

তিনি আরও বলেন, নির্মম হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্র শহীদ হাদীর হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি, যা রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক ও লজ্জাজনক। তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, নবনির্বাচিত শিক্ষার্থী নেতাদের কাছ থেকে এমন স্পষ্ট ও সাহসী অবস্থান শিক্ষার্থী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদদের মতে, এই কবর জিয়ারত কর্মসূচি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি একটি বার্তাবহ উদ্যোগ। একদিকে শহীদ হাদীর কবর জিয়ারত শিক্ষার্থী রাজনীতিতে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির দাবি নতুন করে সামনে আনছে, অন্যদিকে নজরুলের কবর জিয়ারত বিদ্রোহ, মানবিকতা ও সাংস্কৃতিক চেতনার সঙ্গে শিক্ষার্থী রাজনীতির সংযোগকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এই দুই স্মৃতিচিহ্নের সম্মিলিত উপস্থিতি শিক্ষার্থী রাজনীতিকে আদর্শিক ও নৈতিক ভিত্তিতে দাঁড় করানোর ইঙ্গিত দেয়।

শিক্ষার্থী সমাজের অনেকেই মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে সহিংসতা, দখলদারিত্ব ও স্বার্থান্বেষী আচরণের যে অভিযোগ ওঠে, তার প্রেক্ষাপটে এই ধরনের কর্মসূচি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে। নবনির্বাচিত জকসু নেতারা যদি এই মূল্যবোধকে তাদের দৈনন্দিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাস্তবায়ন করতে পারেন, তবে তা শিক্ষার্থী সংসদের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একাংশ এই কর্মসূচিকে স্বাগত জানিয়ে মন্তব্য করেছেন যে, শহীদ ও কবির কবর জিয়ারতের মাধ্যমে জকসুর নেতারা নিজেদের রাজনীতির ভিত্তি কোথায় তা স্পষ্ট করেছেন। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি শহীদ হাদীর বিচার আদায়ে কী ধরনের কার্যকর ভূমিকা তারা রাখবেন। এই প্রশ্ন ও প্রত্যাশাই প্রমাণ করে, শিক্ষার্থী সমাজ নবনির্বাচিত নেতৃত্বের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে আছে।

সব মিলিয়ে, জকসুর নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের এই কর্মসূচি শিক্ষার্থী রাজনীতিতে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার সংযোগকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। শহীদ শরীফ ওসমান হাদী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শুধু অতীতকে স্মরণ করার বিষয় নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি দায়বদ্ধতার ঘোষণা। এখন দেখার বিষয়, এই ঘোষণার প্রতিফলন কতটা দৃশ্যমান হয় জকসুর আগামী দিনের কার্যক্রম ও সিদ্ধান্তে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত