শান্তি আলোচনার মাঝেও তীব্র রাশিয়া-ইউক্রেন হামলা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩১ বার
শান্তি আলোচনার মাঝেও তীব্র রাশিয়া-ইউক্রেন হামলা

প্রকাশ: ৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা, কূটনৈতিক তৎপরতা আর আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার আশ্বাস—সবকিছুর মধ্যেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যেন নতুন করে আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। আলোচনা চললেও বাস্তবতার মাটিতে প্রতিদিনই বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতি, প্রাণহানি ও মানবিক সংকট। বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের আবাসিক এলাকায় রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং তার পাল্টা জবাবে কৃষ্ণসাগরে রুশ বন্দরগামী একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

ইউক্রেনীয় সামরিক ও বেসামরিক সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাশিয়া দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প শহর ক্রিভি রিহে দুটি ‘ইস্কান্দার’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে চালানো এই হামলায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে নারী ও বয়স্কদের সংখ্যাই বেশি বলে স্থানীয় হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় কয়েকটি বহুতল ভবনের জানালা ও দেয়াল ভেঙে পড়ে, আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক পরিবার রাতের মধ্যেই আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে বাধ্য হয়।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শুধু আবাসিক ভবনই নয়, আশপাশের সড়ক, পানি সরবরাহ লাইন ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোরও গুরুতর ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং পানির পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হাজার হাজার মানুষ বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়ে। ইউক্রেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ওলেক্সি কুলেবা জানিয়েছেন, রাতভর হামলার পর দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে ১৭ লাখেরও বেশি পরিবার সরাসরি পানি সংকটের মুখে পড়ে। জরুরি ভিত্তিতে মেরামত কাজ শুরু হলেও এখনো প্রায় ২০ হাজার পরিবার পর্যাপ্ত পানির সুবিধা পাচ্ছে না এবং আড়াই লাখ পরিবারের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

এই হামলার পরপরই ইউক্রেন পাল্টা জবাব দেয় কৃষ্ণসাগরে। তুরস্কের কৃষ্ণসাগর উপকূলের বন্দর শহর ইনেবোলুর কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলার সময় রাশিয়ার নভোরোসিস্ক বন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রারত পালাউ-নিবন্ধিত তেলবাহী ট্যাংকার ‘এলবাস’-এ ড্রোন হামলা চালানো হয়। হামলায় ট্যাংকারটির ওপরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানা গেছে। জাহাজটি তখন বাণিজ্যিক রুটে চলাচল করছিল এবং হামলার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে এর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। রাশিয়া এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো বিবৃতি না দিলেও ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কৃষ্ণসাগরে এ ধরনের হামলা শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষ্ণসাগর অঞ্চল দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাস ও শস্য পরিবহন হয়। ফলে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব ইউরোপ থেকে শুরু করে এশিয়ার বাজারেও পড়তে পারে।

এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই কূটনৈতিক অঙ্গনেও চলছে নানা তৎপরতা। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি শীর্ষ পর্যায়ে স্বাক্ষরের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনের নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করতে এই চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ইউক্রেনের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জেলেনস্কির বক্তব্যে একদিকে যেমন ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের আশা উঠে এসেছে, অন্যদিকে চলমান হামলার বাস্তবতা সেই আশাকে বারবার চ্যালেঞ্জ করছে। যুদ্ধের প্রায় প্রতিটি দিনেই ইউক্রেনের অবকাঠামো নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বাড়ছে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ইউক্রেনের লাখ লাখ মানুষ এখনো নিরাপদ বাসস্থান, পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও মৌলিক সেবার অভাবে দিন কাটাচ্ছেন।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে, তাদের হামলার লক্ষ্য সামরিক অবকাঠামো। তবে বাস্তবে আবাসিক এলাকা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হামলার কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগই বাড়ছে। অন্যদিকে ইউক্রেন বলছে, তারা আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করছে এবং রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে দুর্বল করতেই পাল্টা হামলা চালানো হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো এবং জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বারবার সংযমের আহ্বান জানানো হলেও বাস্তবতায় তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যাচ্ছে। শান্তি আলোচনার টেবিলে যে ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্রে তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই দ্বৈত বাস্তবতা—একদিকে শান্তি আলোচনা, অন্যদিকে তীব্র সামরিক হামলা—ইঙ্গিত দেয় যে উভয় পক্ষই কৌশলগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আলোচনা যতদিন ফলপ্রসূ না হবে, ততদিন যুদ্ধের ময়দানে চাপ বজায় রাখাই যেন তাদের লক্ষ্য।

ক্রিভি রিহের ক্ষতিগ্রস্ত এক বাসিন্দা স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা প্রতিদিন শান্তির কথা শুনি, কিন্তু রাতে যখন বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়, তখন সেই শান্তির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাই না।” এই কথার মধ্যেই যেন ইউক্রেন যুদ্ধের মানবিক চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সব মিলিয়ে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে আলোচনা ও হামলা একসঙ্গে চলছে। শান্তির সম্ভাবনা যেমন আলোচনার কক্ষে উঁকি দিচ্ছে, তেমনি যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রতিদিন সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন করে আঘাত হানছে। এই সংঘাত কবে থামবে, আর কবে সত্যিকারের শান্তি ফিরবে—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত