ফরজ ও নফল ইবাদত: অগ্রাধিকার ভুলে বিভ্রান্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৪ বার
ফরজ নফল ইবাদতের সঠিক অগ্রাধিকার

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসলাম মানবজীবনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ, ভারসাম্যপূর্ণ ও কল্যাণমুখী জীবনব্যবস্থা। এখানে ইবাদত শুধু আখিরাতের সাফল্যের মাধ্যম নয়, বরং দুনিয়াতেও শৃঙ্খলা, ন্যায়বোধ ও আত্মিক প্রশান্তি প্রতিষ্ঠার পথনির্দেশনা। আল্লাহ তায়ালা বান্দার সক্ষমতা ও কল্যাণের কথা বিবেচনা করে ইবাদতকে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করেছেন। এর মধ্যে ফরজ ও নফল ইবাদতের গুরুত্ব ও মর্যাদা আলাদা হলেও, দুটিই ইসলামের সামগ্রিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, পর্যাপ্ত দ্বীনি জ্ঞানের অভাবে আমাদের সমাজে ফরজ ও নফল ইবাদত নিয়ে একধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, যা ইবাদতের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

ফরজ ইবাদত হলো সেই সব আমল, যা আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক করেছেন। এগুলো পালন করা ঈমানের দাবির অন্তর্ভুক্ত। ফরজ ইবাদতের মধ্যে রয়েছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজান মাসের রোজা, নিসাব পরিমাণ সম্পদের ওপর জাকাত আদায় এবং সামর্থ্য থাকলে জীবনে অন্তত একবার হজ পালন। এই ফরজগুলো ইসলামের মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। একজন মুসলিমের ঈমানি পরিচয় ও আমলি জীবন মূলত এসব ফরজ ইবাদতের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে। ফরজ ইবাদত ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করলে তা শুধু গোনাহই নয়, বরং আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ অমান্য করার শামিল, যার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।

অন্যদিকে নফল ইবাদত হলো সেই সব আমল, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় স্বেচ্ছায় আদায় করা হয়। নফল ইবাদত পালন করলে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বিশেষ সওয়াব ও মর্যাদা রয়েছে, তবে তা না করলে কোনো গোনাহ হয় না। নফল নামাজের মধ্যে তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত, আওয়াবিন ও সালাতুত তাসবিহ উল্লেখযোগ্য। নফল রোজার মধ্যে আরাফা, আশুরা, শাবান মাসের রোজা এবং প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজা রয়েছে। কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, দান-সাদকা ও দ্বীনি জ্ঞানার্জনও নফল ইবাদতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নফল ইবাদতের গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। বরং সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ফরজ আদায়ের পর নফল ইবাদতের মাধ্যমেই একজন মুমিন আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নৈকট্য অর্জন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক হাদিসে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, বান্দা প্রথমে ফরজ আমলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করে, এরপর নফল ইবাদতের মাধ্যমে সে আরও কাছাকাছি আসে, এমনকি আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। এই হাদিস নফল ইবাদতের মর্যাদা ও গুরুত্বকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

কিন্তু এখানেই একটি মারাত্মক ভুল ধারণা আমাদের সমাজে শেকড় গেড়ে বসেছে। অনেকেই মনে করেন, ফরজ ইবাদতে ঘাটতি থাকলেও বেশি বেশি নফল ইবাদত করলে আল্লাহ তায়ালা তা ফরজের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করবেন। বাস্তবে এই ধারণার কোনো শরঈ ভিত্তি নেই। ইসলাম কখনোই ফরজের পরিবর্তে নফলকে গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকৃতি দেয়নি।

আমাদের চারপাশে তাকালেই এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়। কেউ নিয়মিত ফরজ নামাজ আদায় না করলেও শবে কদর বা শবে বরাতের রাতে দীর্ঘ নফল নামাজে অংশ নেন। কেউ রমজানের ফরজ রোজা পূর্ণ না রেখেই শাওয়ালের ছয় রোজাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। জাকাতের ক্ষেত্রে ফরজ হিসাব এড়িয়ে গিয়ে দান-সাদকা করেই দায়িত্ব শেষ করেছেন বলে মনে করেন অনেকে। আবার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ফরজ হজ আদায় না করে বারবার নফল ওমরা পালনকেই যথেষ্ট মনে করা হয়। অথচ শরিয়তের দৃষ্টিতে ফরজ হজ আদায় না করলে কোনো নফল ইবাদতই সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারে না।

ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত সুস্পষ্ট—প্রথমে ফরজ, তারপর নফল। ফরজ ইবাদত আদায়ে কোনো ত্রুটি বা ঘাটতি থাকলে আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম দয়ায় নফল ইবাদতের মাধ্যমে তা পূরণ করে দিতে পারেন। কিন্তু ফরজ ইবাদত সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করলে নফলের কোনো মূল্য থাকে না। বিষয়টি একটি সহজ উদাহরণে বোঝা যায়। কোনো পরীক্ষায় যদি অংশগ্রহণই না করা হয়, তাহলে বাড়তি কাজ বা অতিরিক্ত নম্বরের কোনো মূল্য নেই। কিন্তু পরীক্ষায় অংশ নিয়ে যদি কিছু ভুল হয়, তাহলে অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে তা পূরণ করা যেতে পারে। ফরজ ও নফল ইবাদতের সম্পর্কও ঠিক তেমনই।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ফরজ নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ফরজ নামাজ ত্যাগ করে, তার ওপর আল্লাহর জিম্মাদারি থাকে না। আরেক হাদিসে নামাজকে মুসলমান ও কাফেরের মধ্যে পার্থক্যের মানদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হাদিস স্পষ্ট করে দেয় যে ফরজ ইবাদত অবহেলা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আজকের বাস্তবতায় এই বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ হলো আবেগনির্ভর ইবাদতচর্চা ও সামাজিক প্রচলন। কিছু বিশেষ রাত বা দিনে নফল ইবাদতের ব্যাপক প্রচার থাকলেও ফরজ ইবাদতের প্রতি সেই গুরুত্ব আরোপ করা হয় না। ফলে সাধারণ মানুষ মনে করে, বিশেষ কিছু নফল আমল করলেই দায়িত্ব শেষ। অথচ ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে ফরজ ইবাদতকে ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করেছে।

অতএব একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো ইবাদতের ক্ষেত্রে সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। প্রথমে ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা, এরপর নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা। পাশাপাশি সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো সংশোধনে ভূমিকা রাখা এবং সঠিক দ্বীনি জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া। তাহলেই ইবাদত হবে ফলপ্রসূ, জীবন হবে ভারসাম্যপূর্ণ এবং আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন সহজতর হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত