নাজমুলের পদত্যাগ না হলে খেলা বন্ধে অনড় ক্রিকেটাররা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬২ বার
নাজমুলের পদত্যাগ না হলে খেলা বন্ধে অনড় ক্রিকেটাররা

প্রকাশ:  ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন করে গভীর সংকটের ইঙ্গিত মিলছে। বিসিবির পরিচালক এম নাজমুল ইসলামকে ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন মাঠের খেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রূপ নিচ্ছে। ক্রিকেটারদের কড়া আলটিমেটামের পর ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি পদত্যাগ না করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিপিএলসহ ঘরোয়া সব ধরনের ক্রিকেট স্থবির হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঘটনার সূত্রপাত গতকাল, বিসিবির এক দোয়া ও মিলাদ মাহফিল শেষে দেওয়া নাজমুল ইসলামের কিছু মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। প্রয়াত তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স ও বোর্ডের ব্যয়ের বিষয়টি টেনে এনে যে ভাষায় কথা বলেন, সেটি ক্রিকেটাঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। বিশেষ করে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রত্যাশিত সাফল্য না এলে খেলোয়াড়দের পেছনে ব্যয় করা অর্থ ফেরত নেওয়ার ইঙ্গিত তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে বলে অভিযোগ করেন ক্রিকেটাররা।

নাজমুলের ওই মন্তব্যের পরপরই ক্রিকেটারদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় দল থেকে শুরু করে ঘরোয়া লিগে খেলা শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররা এটিকে ‘অপমানজনক ও অমানবিক’ আখ্যা দিয়ে পরিচালক হিসেবে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেন। ক্রিকেটারদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গতকাল বেলা একটার মধ্যে পদত্যাগ না করলে তারা কোনো ধরনের খেলা মাঠে নামবেন না। সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও পদত্যাগ না করায় তারা এখনো সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছেন।

এরই প্রতিফলন দেখা যায় বিপিএলে। দুপুরের ম্যাচে অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও চট্টগ্রাম রয়্যালস ও নোয়াখালী এক্সপ্রেসের কোনো দলই নির্ধারিত সময়ে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পৌঁছায়নি। মাঠ, সম্প্রচারক ও দর্শকদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ক্রিকেট বোর্ডের একাধিক পরিচালক খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে জানা গেছে।

বিসিবির পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে মধ্যপন্থী একটি প্রস্তাবও দেওয়া হয়। সূত্রের খবর, বোর্ড নাজমুল ইসলামকে অর্থ বিভাগের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছিল। কিন্তু ক্রিকেটাররা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, শুধু দায়িত্ব পরিবর্তন নয়, পরিচালক পদ থেকে তাঁর পূর্ণ পদত্যাগই একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান। তাদের মতে, এমন বক্তব্যের পর তিনি নৈতিকভাবে এই পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন।

এই টানাপোড়েনের মধ্যেই বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিসিবি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নাজমুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে। বোর্ড এটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করলেও ক্রিকেটারদের অবস্থান এতে নরম হয়নি। তারা বলছেন, শোকজ নোটিশ যথেষ্ট নয়; তাদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষায় দ্রুত ও দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবের নেতৃত্বে কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটার মাঠে এসে সংবাদ সম্মেলন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানা গেছে। সেখানে তারা নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করবেন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচি জানাবেন। কোয়াবের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, খেলোয়াড়রা কোনো সংঘাতে যেতে চান না, কিন্তু সম্মানহানির ঘটনায় নীরব থাকা সম্ভব নয়।

এই আন্দোলনের প্রভাব ইতিমধ্যে ঘরোয়া ক্রিকেটেও পড়েছে। ক্রিকেটারদের আলটিমেটামের পর প্রথম বিভাগ লিগ গভীর রাতে স্থগিত করা হয়। বোর্ডের একটি সূত্র জানায়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অন্যান্য লিগ নিয়েও সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকতে পারে। এতে করে পুরো মৌসুমের সূচি এলোমেলো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নাজমুল ইসলামের বিতর্কিত মন্তব্যগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আসরে ভালো না খেললে ক্রিকেটারদের পেছনে ব্যয় করা কোটি কোটি টাকার জবাবদিহি করতে হবে কি না, সে প্রশ্ন তোলা যায়। এমনকি তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, এত খরচের পরও বাংলাদেশ এখনো কোনো বৈশ্বিক পুরস্কার পায়নি। তাঁর এই বক্তব্যকে অনেকেই খেলোয়াড়দের পেশাদারিত্ব ও আত্মসম্মানে আঘাত হিসেবে দেখছেন।

ক্রিকেট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল একটি বক্তব্যের বিতর্ক নয়; বরং বোর্ড ও খেলোয়াড়দের মধ্যে দীর্ঘদিনের আস্থার সংকটের বহিঃপ্রকাশ। আধুনিক ক্রিকেটে খেলোয়াড়রা শুধু কর্মী নন, তারা একটি দেশের ক্রীড়া-পরিচয়ের বাহক। সেই বাস্তবতায় তাদের প্রতি দায়িত্বশীল ও সম্মানজনক আচরণ অপরিহার্য বলে মত দেন তারা।

অন্যদিকে বোর্ডের ভেতরেও মতভেদ স্পষ্ট হচ্ছে। কেউ কেউ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার পক্ষে, আবার কেউ আইনি ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর জোর দিচ্ছেন। এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বই সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে। একদিকে বিপিএল, ঘরোয়া লিগ ও জাতীয় দলের প্রস্তুতি; অন্যদিকে খেলোয়াড়দের সম্মান ও প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন। নাজমুল ইসলামের পদত্যাগ কিংবা বোর্ডের কঠোর সিদ্ধান্ত—যে পথই নেওয়া হোক না কেন, দ্রুত ও স্পষ্ট সমাধান ছাড়া এই সংকট কাটানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা। মাঠের বাইরে শুরু হওয়া এই লড়াই শেষ পর্যন্ত মাঠের খেলাকেই থামিয়ে দেয় কি না, সেদিকেই এখন তাকিয়ে দেশের ক্রীড়াপ্রেমীরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com