সৌদিগামী ১৪১ ফ্লাইট বাতিলে দুর্ভোগে হাজারো যাত্রী

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩ বার
সৌদিগামী ১৪১ ফ্লাইট বাতিলে দুর্ভোগে হাজারো যাত্রী

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথির হামলাকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবের আকাশপথে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হওয়ায় ঢাকা থেকে রিয়াদ ও দাম্মামগামী ১৪১টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। গত ১০ অক্টোবর থেকে ২৩ অক্টোবর শুক্রবার রাত পর্যন্ত এসব ফ্লাইট বাতিলের ঘটনায় ভোগান্তিতে পড়েছেন মোট ২১ হাজার ৯৩৩ জন যাত্রী। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সূত্রে পাওয়া এ তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি ফ্লাইটের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের বিমান সংস্থার ট্রানজিট ফ্লাইটও বাতিল হয়েছে। ফলে সৌদি আরবগামী যাত্রীদের যাত্রা পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আকাশপথে সংযোগ ও সময়সূচি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মসংস্থান, ব্যবসা, পারিবারিক প্রয়োজনে এবং ধর্মীয় উদ্দেশ্যে দেশটিতে যাতায়াত করেন। তাঁদের অনেকের জন্য নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে প্রবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে যাত্রার তারিখ পরিবর্তন হলে চাকরিতে যোগদান, নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ, আবাসন এবং অন্যান্য প্রস্তুতির ওপর প্রভাব পড়তে পারে। আবার যাঁরা দেশে ফেরার পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও ফ্লাইট বাতিল হলে কর্মস্থলে উপস্থিতি কিংবা পারিবারিক দায়িত্ব পালনে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে ১৪১টি ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা কেবল বিমান চলাচলের সময়সূচিতে পরিবর্তন নয়, হাজারো যাত্রীর ব্যক্তিগত ও আর্থিক পরিকল্পনার ওপরও প্রভাব ফেলেছে।

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, বাতিল হওয়া সরাসরি ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৭টি। সৌদি আরবের সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ১৯টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এ ছাড়া ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের ১০টি ফ্লাইট বাতিলের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ফ্লাইটের যাত্রীদের যাত্রা পুনর্নির্ধারণ বা বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। তবে প্রতিটি বিমান সংস্থা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের নতুন সময়সূচি দিচ্ছে, তাঁদের টিকিটের মেয়াদ বা অর্থ ফেরতের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

সরাসরি ফ্লাইটের বাইরে ট্রানজিটভিত্তিক যাত্রাও বড় ধরনের প্রভাবের মুখে পড়েছে। বেবিচকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে ৭৫টি ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে ইন্ডিগোর ২৯টি, এমিরেটসের ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৯টি, ফ্লাইদুবাইয়ের ৮টি, সালামএয়ারের ৭টি, এয়ার ইন্ডিয়ার ৭টি এবং ইজিপ্ট এয়ারের একটি ফ্লাইট রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার এসব ফ্লাইটের মাধ্যমে যাত্রীরা এক বা একাধিক বিমানবন্দর হয়ে সৌদি আরবে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু কোনো একটি সংযোগকারী ফ্লাইট বাতিল হলে পুরো যাত্রাপথের সময়সূচি বদলে যেতে পারে। কখনো নতুন ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, আবার কখনো বিকল্প রুট খুঁজতে হয়। এতে যাত্রার সময় ও ব্যয়—দুটিই বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মামগামী ফ্লাইট বাতিলের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে ইয়েমেনের হুথি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলাকে ঘিরে সৃষ্ট নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে হামলার ঘটনায় রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। একই সঙ্গে দাম্মামেও হামলার ঘটনা ঘটে। এ পরিস্থিতিতে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয় এবং সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলো তাদের ফ্লাইট পরিচালনার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেয়।

নিরাপত্তার প্রশ্নে বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও বিমান সংস্থাগুলোকে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। বিমানবন্দরের কার্যক্রম, আকাশসীমার নিরাপত্তা, সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি, সংশ্লিষ্ট দেশের নির্দেশনা এবং বিকল্প রুট ব্যবহারের সুযোগ—এসব বিষয় ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। কোনো গন্তব্যে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে নির্ধারিত ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা বা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে প্রতিটি ফ্লাইট বাতিলের পেছনে ঠিক কোন নির্দিষ্ট কারণ কাজ করেছে, তা আলাদাভাবে নিশ্চিত না করে সব বাতিলকে একই ঘটনার সরাসরি ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আগেই রিয়াদ ও দাম্মামগামী ফ্লাইট পরিচালনায় পরিবর্তন এনেছিল। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে সংস্থাটি ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত এই দুই গন্তব্যে নিজেদের ফ্লাইট বন্ধ রেখেছিল। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য বিমান সংস্থাও ফ্লাইট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে পরিস্থিতির প্রভাব একক কোনো সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সরাসরি ও ট্রানজিট—দুই ধরনের যাত্রাপথেই বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

যাত্রীদের দুর্ভোগের একটি বড় দিক হলো অনিশ্চয়তা। নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছানো, লাগেজ প্রস্তুত করা, পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া কিংবা কর্মস্থলে যোগদানের ব্যবস্থা করার পর ফ্লাইট বাতিলের খবর পেলে নতুন করে পরিকল্পনা সাজাতে হয়। যাঁরা দূরবর্তী জেলা থেকে ঢাকায় এসে ফ্লাইট ধরার প্রস্তুতি নেন, তাঁদের ক্ষেত্রে যাতায়াত ও অবস্থানের অতিরিক্ত খরচও তৈরি হতে পারে। একইভাবে ট্রানজিটের মাধ্যমে যাত্রা করার পরিকল্পনা করা যাত্রীদের অন্য দেশের বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে হতে পারে। তবে বাতিল হওয়া ফ্লাইটের যাত্রীদের মধ্যে কতজন বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন, কতজন নতুন টিকিট পেয়েছেন কিংবা কতজনের যাত্রা পুনর্নির্ধারণ হয়েছে—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়নি।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিমান সংস্থার কাছ থেকে হালনাগাদ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া। ফ্লাইটের নতুন সময়সূচি, বিকল্প যাত্রাপথ, টিকিট পরিবর্তনের শর্ত এবং অর্থ ফেরতের নীতিমালা স্পষ্টভাবে জানানো হলে যাত্রীদের অনিশ্চয়তা কিছুটা কমতে পারে। একই সঙ্গে বিমানবন্দর ও সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারীদের সঙ্গে সমন্বয় করে যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে বয়স্ক যাত্রী, শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি এবং জরুরি প্রয়োজনে যাত্রা করতে ইচ্ছুক মানুষের ক্ষেত্রে তথ্য ও সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের শ্রমবাজার ও জনসম্পর্কের গভীরতা বিবেচনায় ফ্লাইট চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নের প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। প্রবাসী কর্মীদের যাত্রা বিলম্বিত হলে নিয়োগসংক্রান্ত সময়সীমা, কর্মস্থলে যোগদান এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসতে পারে। ব্যবসায়িক যাত্রীদের ক্ষেত্রেও বৈঠক, চুক্তি বা অন্যান্য নির্ধারিত কার্যক্রম পিছিয়ে যেতে পারে। তবে এসব সম্ভাব্য প্রভাবের প্রকৃত মাত্রা নির্ভর করবে ফ্লাইট পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের জন্য কী ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয় তার ওপর।

এদিকে, নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্তও বদলাতে পারে। তাই যাত্রীদের যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার কাছ থেকে সরাসরি ফ্লাইটের অবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পুরোনো টিকিট বা পূর্বনির্ধারিত সময়সূচির ওপর নির্ভর না করে নতুন নির্দেশনা যাচাই করলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিমানবন্দরে গিয়ে অপেক্ষা করার ঝুঁকি কমতে পারে। ট্রানজিট যাত্রীদের ক্ষেত্রেও প্রতিটি সংযোগকারী ফ্লাইটের অবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি, কারণ একটি ফ্লাইট বাতিল হলে পরবর্তী যাত্রার ব্যবস্থাও পরিবর্তিত হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ১০ অক্টোবর থেকে ২৩ অক্টোবর রাত পর্যন্ত ঢাকা থেকে সৌদি আরবগামী ১৪১টি ফ্লাইট বাতিল এবং ২১ হাজার ৯৩৩ জন যাত্রীর ভোগান্তি আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে প্রভাবের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। রিয়াদ ও দাম্মামগামী সরাসরি ফ্লাইটের পাশাপাশি ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বহু যাত্রীর পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের হালনাগাদ তথ্য দেওয়া, বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা সহজ করা এবং টিকিট পরিবর্তনসংক্রান্ত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে আকাশপথের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com