স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি নাহিদের

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩ বার
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি নাহিদের

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, গত সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। একই সময়ে জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায়ও সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এসব পরিস্থিতির দায় সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রীকে নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় এনসিপির সপ্তাহব্যাপী লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ কর্মসূচির সূচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম এ দাবি জানান। তাঁর বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ এবং সরকারের জবাবদিহির প্রশ্ন গুরুত্ব পায়। এসব ইস্যুতে জনমত গড়ে তুলতে আগামী ৩০ অক্টোবর ঢাকায় গণবিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণাও দেন তিনি।

নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ নিজেদের অসহায় মনে করছেন। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এ অবস্থায় মন্ত্রিপরিষদ পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আপাতত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, গত সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সাফল্য পাওয়া যায়নি। তাঁর অভিযোগ, মাদক কারবার, অপরাধ, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের মতো সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ ও বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগও তোলেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের বক্তব্য বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া ছাড়া একক বক্তব্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

জ্বালানি খাত নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে এ খাতে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে এবং জ্বালানিমন্ত্রী নিজের অবস্থান থেকে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে পারছেন না। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে তুলে ধরা হলেও সংকট মোকাবিলায় সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে পরিবহন, পণ্য উৎপাদন ও বাজারদরের ওপর।

কারওয়ান বাজারকে গণসংযোগ কর্মসূচির সূচনাস্থল হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, রাজধানীর কাঁচাবাজার ও সবজির সরবরাহব্যবস্থায় এই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বাজারটিতে চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের সমস্যা রয়েছে। কয়েক মাস আগে ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে চাঁদাবাজদের প্রতিহত করেছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলদারত্ব ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম কারওয়ান বাজারের কয়েকটি পণ্যের দাম উল্লেখ করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ২০০ থেকে ২১০ টাকা, টমেটো প্রতি কেজি ১৬০ থেকে ২০০ টাকা, করলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, শুকনা মরিচ ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং ডিম প্রতি ডজন ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। এসব দাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে আগের মতো পরিমাণে খাদ্যপণ্য কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে বাজারদর স্থান, সময়, পণ্যের মান ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।

নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু বাজারের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবারের মাসিক ব্যয় সামলাতে গিয়ে অনেক মানুষকে খাবারের তালিকা, যাতায়াত, চিকিৎসা কিংবা শিক্ষার খরচের মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয়। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে এই চাপ আরও বেশি অনুভূত হতে পারে। নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে বাজারের এই বাস্তবতা তুলে ধরে সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখা, সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় এসেছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার তিন দফায় অকটেনের দাম বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে তুলে ধরা হলেও তার প্রভাব সামাল দিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দামও বেড়েছে। তিনি সরকারি ও বেসরকারি বাজারে এলপিজির দামের পার্থক্যের কথা উল্লেখ করে সাধারণ মানুষের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে আনেন। এসব মূল্যসংক্রান্ত দাবির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে সংশ্লিষ্ট সময়ের সরকারি মূল্যতালিকা এবং বাজারের তথ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্যে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নও তোলেন এনসিপি নেতা। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়েছে এবং গণমাধ্যম বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রকাশ করতে গিয়ে চাপের মুখে পড়ছে। নেত্রকোনায় ১৫ অক্টোবর একজন সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা, পরদিন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আরেকজনকে গুলি করার ঘটনা এবং কক্সবাজারে যানবাহনে ডাকাতি ও লুটপাটের অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এসব ঘটনা তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনার কারণে গ্রেপ্তার এবং সাইবার আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, সমালোচনামূলক বক্তব্যের কারণে নাগরিকদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং প্রস্তাবিত আইনি পরিবর্তন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি সাইবার আইনসংক্রান্ত সংশোধনী উদ্যোগ বাদ দেওয়া এবং কর্তৃত্ববাদী বলে বিবেচিত কিছু আইন বাতিলের দাবি জানান। একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত আইন ও প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গেও এনসিপির অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। নাহিদ ইসলামের দাবি, একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে নতুন সংস্কারকৃত সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। জুলাই সনদে উত্থাপিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি। পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং শহীদ ও আহতদের পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

আগামী ৩০ অক্টোবরের গণবিক্ষোভকে সামনে রেখে এনসিপি চারটি প্রধান ইস্যুতে জনমত গড়ে তুলতে চায় বলে নাহিদ ইসলাম জানান। তাঁর বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগকে কর্মসূচির মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। তিনি জানান, ওই দিন দুপুর ৩টায় ঢাকার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণবিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হবে। পরে রাজধানীর বাইরে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও ধারাবাহিক কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও সমালোচনা করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর অভিযোগ, সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো ও ক্ষমতার চর্চায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ভারতের সম্পর্ক নিয়ে তিনি বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন এবং গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানান। এসব বক্তব্য রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ; সংশ্লিষ্ট দল ও সরকারের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়গুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।

দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম দেশের সাধারণ মানুষকে ধন্যবাদ জানান। তাঁর দাবি, ধর্মীয় উৎসবের সময় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং রাজনৈতিক পক্ষের সহযোগিতা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ভূমিকা রেখেছে। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিয়ে তিনি সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

এনসিপির সাংগঠনিক কার্যক্রম প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচনের পর নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ায় দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের জন্য কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।

সব মিলিয়ে, নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে সরকারের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিরোধী দলের অসন্তোষ স্পষ্ট হয়েছে। তবে পদত্যাগের দাবি এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলোর জবাব সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বাজারদর নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কমতে পারে। আগামী ৩০ অক্টোবরের গণবিক্ষোভে জনসাড়া কেমন হয় এবং সরকারের পক্ষ থেকে এসব দাবির বিষয়ে কী প্রতিক্রিয়া আসে, তা দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com