আওয়ামী লীগ ইস্যুতে বিএনপি-জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
আওয়ামী লীগ ইস্যুতে বিএনপি-জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে ঘিরে নতুন করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। শ্রমিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং দেশের স্থিতিশীলতা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন সমঝোতা ও রাজনৈতিক সখ্যের অভিযোগ তুলছে। ক্ষমতাসীন দলের দাবি, বিরোধী পক্ষের ইন্ধনে দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে জামায়াতের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে বিএনপি। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, অভিযোগগুলোর পেছনে কতটা বাস্তব তথ্য রয়েছে, আর কতটা প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার কৌশল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পারস্পরিক দোষারোপের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকে ঘিরে বিতর্কের সুযোগে দলটির রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও মেরুকরণ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাঁদের পরামর্শ, অভিযোগের বদলে তথ্যপ্রমাণ সামনে আনা এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি।

দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন পর্যায়ে একসঙ্গে রাজপথে ছিল। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর তাদের সম্পর্কেও নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য সরকারকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই মতপার্থক্য দেখা দেয়। এর সঙ্গে জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনা যুক্ত হওয়ায় রাজনৈতিক দূরত্ব আরও বেড়েছে।

সরকারের মেয়াদ সাত মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই বিরোধী দল লংমার্চ, বিভাগীয় সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। এসব কর্মসূচিতে সরকারের নীতির সমালোচনার পাশাপাশি সরকার পতনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরকারকে আর সহযোগিতা করা হবে না বলে ঘোষণা দেন। ফলে সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকার-বিরোধী দলের সম্পর্ক আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এদিকে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে বকেয়া বেতন পরিশোধ, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এবং অন্যান্য দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে। শ্রমিকদের এসব দাবির বিষয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিরোধী দল সমালোচনা করছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এসব আন্দোলনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে এবং এর পেছনে বিরোধী দলের ইন্ধন থাকতে পারে। সরকারি দলের অভিযোগ অনুযায়ী, আন্দোলন জোরদার করতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিরোধী পক্ষের সমঝোতা রয়েছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের নির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে, তা প্রকাশ্যে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়নি।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাল্টা দাবি করা হচ্ছে, তাদের রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। জামায়াতের নেতাদের অভিযোগ, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে বিরোধী মতকে দমন করার চেষ্টা করছে। ফলে শ্রমিক অসন্তোষের মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুও দলীয় রাজনৈতিক বিরোধের অংশ হয়ে উঠছে। তবে দুই পক্ষের বক্তব্যের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও যাচাইযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ বা সখ্যের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলের বিরুদ্ধেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্বাচনি সভায় বক্তব্য দেওয়া, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে যোগাযোগ এবং আটক নেতাকর্মীদের মুক্তির জন্য তদবিরের মতো বিষয় আলোচনায় আসে বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এসব ঘটনার প্রকৃতি, ব্যাপ্তি এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা একেক ক্ষেত্রে আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

নির্বাচনের আগে দুই দলের তুলনায় বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীর যোগাযোগ বেশি দৃশ্যমান ছিল বলেও রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে আসে। নির্বাচনের পর দেশের কয়েকটি স্থানে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খোলার খবর পাওয়া যায়। কোথাও কোথাও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের উপস্থিতিতে কার্যালয় খোলার ঘটনাও সামনে আসে। পরে কিছু স্থানে বিএনপির নেতাকর্মী ও জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাংশ এসব কার্যালয় ভাঙচুর বা বন্ধ করে দেন বলে জানা যায়। একই সময়ে আওয়ামী লীগের কয়েকজন কারাবন্দি নেতাকর্মী জামিনে মুক্ত হন এবং আত্মগোপনে থাকা কারও কারও প্রকাশ্যে আসার খবরও আলোচনায় আসে। তবে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা থেকে সামগ্রিক রাজনৈতিক সমঝোতার সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে আরও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।

সম্প্রতি ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে বিতর্কের পর আওয়ামী লীগের গোপন তৎপরতার অভিযোগ আবার সামনে এসেছে। বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল, কথিত লকডাউন কর্মসূচি, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগের পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলন নিয়েও রাজনৈতিক বক্তব্য জোরালো হয়েছে। সরকার এ পরিস্থিতিতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তৎপরতা পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে গ্রেপ্তার অভিযান জোরদার রাখার কথাও বলা হয়েছে। তবে বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তদন্তের ফল ও প্রমাণই চূড়ান্ত বিবেচ্য হওয়া উচিত।

গত মঙ্গলবার রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলমান শ্রমিক অসন্তোষের প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, তাঁর কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারী শক্তির পক্ষ থেকে অর্থ সরবরাহ করা হচ্ছে এবং দেশের ভেতরে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। বক্তব্যে তিনি সীমান্তের ওপার থেকে অর্থায়ন এবং দেশের ভেতরে রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগও তোলেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর উল্লেখ করা গোয়েন্দা তথ্যের বিস্তারিত বিবরণ বা সেগুলোর সমর্থনে প্রকাশ্য প্রমাণ সামনে আসেনি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরদিন রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার পাল্টা অভিযোগ করেন, বিএনপি দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করছে এবং দলটিকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিচ্ছে। শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবির বিষয়ে তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্যে শ্রমিক অসন্তোষকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখার পরিবর্তে শ্রমিকদের দাবির প্রতি সরকারের সাড়া দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

বৃহস্পতিবার রাজধানীতে আরেক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিরোধী দলের সম্পর্কের প্রমাণ রয়েছে। জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি অভিযোগ করেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও একটি গুপ্ত দল অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে এবং তাদের বক্তব্য ও আচরণে মিল রয়েছে। তবে তিনি যে প্রমাণের কথা উল্লেখ করেছেন, তার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফলে দুই পক্ষের বক্তব্যের পাশাপাশি নিরপেক্ষভাবে তথ্য যাচাইয়ের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সাহাবুল হক মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে গোয়েন্দা তথ্যের কথা বলে থাকলে সেই তথ্যের প্রমাণক তুলে ধরে বিষয়টি পরিষ্কার করা উচিত। একইভাবে বিরোধী দলকেও তাদের পাল্টা অভিযোগের ব্যাখ্যা দিতে হবে। তা না হলে বিতর্কের সুযোগ নিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নতুন করে রাজনৈতিক তৎপরতা বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, পারস্পরিক দোষারোপের কারণে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত দেশও লাভবান হবে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তারেক ফজলও অভিযোগগুলোর ভিত্তি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, বক্তব্যগুলো কতটা গভীর অনুসন্ধান ও সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যেও এ ধরনের বক্তব্য সামনে আসতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, দোষারোপের রাজনীতি চলতে থাকলে বিতাড়িত রাজনৈতিক শক্তি সুবিধা পেতে পারে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে দুই পক্ষেরই সংযত হওয়া প্রয়োজন।

সামগ্রিকভাবে আওয়ামী লীগকে ঘিরে বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দেশের রাজনীতিতে আস্থার সংকটকে সামনে এনেছে। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি সরবরাহ ও আইনশৃঙ্খলার মতো বাস্তব সমস্যার সমাধান রাজনৈতিক বিতর্কের আড়ালে চাপা পড়ে গেলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অভিযোগের জবাব অভিযোগ দিয়ে না দিয়ে প্রমাণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে বিতর্ক নিষ্পত্তি করাই হতে পারে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণের পরিচয়। দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষের সামনে এখন সেই চ্যালেঞ্জই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com