এক ম্যাচে ফিফটি-সেঞ্চুরি, বাবার পথে আলী রাজ্জাক

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
এক ম্যাচে ফিফটি-সেঞ্চুরি, বাবার পথে আলী রাজ্জাক

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাকিস্তানের সাবেক তারকা অলরাউন্ডার আবদুল রাজ্জাকের ছেলে আলী রাজ্জাক ব্যাট হাতে দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টস ট্রফির শেষ রাউন্ডে একই ম্যাচে অর্ধশতক ও শতক হাঁকিয়ে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়েছেন ২২ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। চাপের মুখে দলের হাল ধরে ১১১ রানে অপরাজিত থাকার পাশাপাশি ম্যাচের প্রথম ইনিংসেও তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ৬৪ রান। দুই ইনিংসে এমন ধারাবাহিক পারফরম্যান্স আলীকে পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটের আলোচিত তরুণ ব্যাটসম্যানদের একজন হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছে।

আলী রাজ্জাকের এই সাফল্যের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে তাঁর পারিবারিক ক্রিকেট-পরিচয়ের কারণে। তাঁর বাবা আবদুল রাজ্জাক পাকিস্তানের হয়ে দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন এবং ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই অবদান রাখার জন্য পরিচিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাবার অর্জনের কারণে আলীর ওপর স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি আগ্রহ রয়েছে। তবে বাবার পরিচয়ের বাইরে নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে আলাদা অবস্থান তৈরি করাই এখন তাঁর সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। প্রেসিডেন্টস ট্রফিতে সাম্প্রতিক ইনিংস দুটি সেই পথচলায় উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

ঘানি দলের হয়ে খেলছেন আলী। টুর্নামেন্টের শেষ রাউন্ডে তাঁর দলের প্রতিপক্ষ ছিল অয়েল অ্যান্ড গ্যাস। ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে একপর্যায়ে ১৪৯ রানে পাঁচ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে ঘানি। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাট করতে নামেন আলী রাজ্জাক। দলের সামনে তখন শুধু রান বাড়ানোর লক্ষ্য ছিল না, বরং দ্রুত উইকেট হারানোর ধাক্কা সামলে ইনিংসকে স্থিতিশীল করাও জরুরি হয়ে উঠেছিল। সাত নম্বরে নেমে তিনি দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের মাধ্যমে সেই কাজটি করেন।

প্রথমে আরেক অলরাউন্ডার হুসাইন তালাতের সঙ্গে ষষ্ঠ উইকেটে ১০৯ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন আলী। তালাত নিজেও ১০৮ রানের ইনিংস খেলেন। এই জুটি ঘানিকে বিপর্যয়ের পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেয়। এরপর হাশিবুল্লাহ খানের সঙ্গে সপ্তম উইকেটে আরও ১২০ রান যোগ করেন আলী। পরপর দুটি কার্যকর জুটি গড়ে তিনি শুধু নিজের ইনিংসই বড় করেননি, দলের ব্যাটিংয়ের ভিতও মজবুত করেন।

শেষ পর্যন্ত ১৫১ বল মোকাবিলা করে আটটি চার ও ছয়টি ছক্কার সাহায্যে ১১১ রানে অপরাজিত থাকেন আলী রাজ্জাক। তাঁর ইনিংসে ছিল ধৈর্য ও আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের সমন্বয়। প্রয়োজনের সময় উইকেট ধরে রেখে রান সংগ্রহ করা এবং সুযোগ পেলে বাউন্ডারিতে বল পাঠানোর ক্ষমতা এই ইনিংসকে বিশেষ করে তুলেছে। যদিও ম্যাচের চূড়ান্ত ফল ড্র, তবু চাপের মধ্যে তাঁর ব্যাটিং ঘানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি হয়ে উঠেছে।

এই ম্যাচে আলীর অবদান শুধু দ্বিতীয় ইনিংসের শতকেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রথম ইনিংসেও তিনি ৬৪ রান করেন। সাতটি চার ও দুটি ছক্কায় সাজানো সেই ইনিংসের ওপর ভর করে ঘানি ২৩২ রান সংগ্রহ করে। জবাবে অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ইমাম-উল-হকের ডাবল সেঞ্চুরির সাহায্যে ৪১০ রানে নয় উইকেট হারানোর পর প্রথম ইনিংস ঘোষণা করে। প্রতিপক্ষের বড় সংগ্রহের মুখেও আলীর দুই ইনিংসের রান তাঁর ধারাবাহিকতার পরিচয় তুলে ধরে।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এটি আলীর তৃতীয় শতক এবং চলতি মৌসুমে দ্বিতীয়। এর আগে মৌসুমের প্রথম শতকটি এসেছিল ফাইনালে ওঠা স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে ১০১ রান করেছিলেন তিনি। তবে ব্যক্তিগতভাবে শতরানের সাফল্য পেলেও ঘানি ম্যাচটি ইনিংস ও ১৮ রানে হেরে যায়। দলীয় ফল অনুকূলে না থাকলেও সেই ইনিংস আলীর ব্যাটিং সামর্থ্যের ইঙ্গিত দিয়েছিল। প্রেসিডেন্টস ট্রফির শেষ রাউন্ডে আবারও শতক করে তিনি নিজের ফর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন।

চলতি প্রেসিডেন্টস ট্রফিতে আলীর পরিসংখ্যানও তাঁর সাম্প্রতিক উন্নতির ছবি তুলে ধরে। ১১ ইনিংসে তাঁর সংগ্রহ ৪৮৩ রান, ব্যাটিং গড় ৫৩ দশমিক ৬৬। এই সময়ে তিনি করেছেন দুটি শতক ও তিনটি অর্ধশতক। ঘানি দলের হয়ে মৌসুমে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহকও তিনি। একটি দীর্ঘ ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় নিয়মিত রান করা তরুণ ব্যাটসম্যানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এক বা দুটি বড় ইনিংসের বাইরে ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির অন্যতম মাপকাঠি।

আলীর ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি তাঁর অলরাউন্ডার পরিচয়ও আলোচনায় রয়েছে। বাবা আবদুল রাজ্জাক ছিলেন এমন একজন ক্রিকেটার, যিনি ব্যাট হাতে ম্যাচের গতি বদলাতে পারতেন এবং বল হাতে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের চ্যালেঞ্জ জানাতেন। আলীও পেস বোলিং করেন। যদিও এখন পর্যন্ত তাঁর বোলিংয়ের পরিসংখ্যান ব্যাটিংয়ের মতো নজরকাড়া নয়, তবু ক্রিকেটের দুই বিভাগেই অবদান রাখার সুযোগ তাঁর সামনে রয়েছে। চলতি মৌসুমে সাত ইনিংসে ২৬ দশমিক ৪ ওভার বোলিং করে তিনি নিয়েছেন দুটি উইকেট।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১৬ ম্যাচ খেলে আলীর মোট রান ৯৮৭, ব্যাটিং গড় ৩৯ দশমিক ৪৮। তাঁর বয়স বিবেচনায় এই পরিসংখ্যানকে আরও উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক শতকগুলো তাঁকে আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারে, তবে দীর্ঘ মেয়াদে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বিভিন্ন ধরনের পিচ, প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণ এবং ম্যাচের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা ধরে রাখতে হবে। পাশাপাশি বোলিংয়ে কার্যকারিতা বাড়াতে পারলে তাঁর অলরাউন্ডার পরিচয় আরও দৃঢ় হতে পারে।

এ বছরের শুরুতে পাকিস্তানের ন্যাশনাল টি-টোয়েন্টি কাপেও নজর কেড়েছিলেন আলী। টুর্নামেন্টে অভিষেকেই এক ওভারে ২৬ রান তোলেন তিনি। লাহোর ব্লুজের হয়ে মুলতান রিজিয়নের বিপক্ষে ২৬ বলে ৪৫ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেছিলেন। সংক্ষিপ্ত সংস্করণে দ্রুত রান তোলার সেই সামর্থ্যের পর এবার দীর্ঘ সংস্করণের ঘরোয়া ক্রিকেটেও নিজের ব্যাটিং দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। দুই ধরনের ক্রিকেটে ভিন্ন পরিস্থিতিতে অবদান রাখার অভিজ্ঞতা তাঁর বিকাশে সহায়ক হতে পারে।

তবে বাবার সঙ্গে তুলনা ঘিরে আলীর ক্রিকেটজীবনে প্রত্যাশার চাপও থাকবে। আবদুল রাজ্জাক পাকিস্তানের হয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করেছিলেন। তাঁর ছেলে হিসেবে আলীর প্রতি দর্শকদের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু একজন ক্রিকেটারের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁর নিজের পারফরম্যান্স, ধারাবাহিকতা ও দলের প্রয়োজনে অবদানের ভিত্তিতে। বাবার সাফল্যের সঙ্গে তুলনা তাঁকে পরিচিতি এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ ক্রিকেটজীবন গড়ে তুলতে হলে আলীকে নিজের দক্ষতা ও খেলার ধরন দিয়ে স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে হবে।

ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফরম্যান্স জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যদিও ভালো পরিসংখ্যানই ভবিষ্যৎ নির্বাচনের নিশ্চয়তা নয়। ধারাবাহিক রান, পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং, ফিটনেস, বোলিংয়ের উন্নতি এবং দলের ভারসাম্যে অবদান—সবকিছুই বিবেচনায় আসতে পারে। আলীর সামনে এখন তাই সবচেয়ে বড় কাজ হলো সাম্প্রতিক সাফল্যকে নিয়মিত পারফরম্যান্সে রূপ দেওয়া।

প্রেসিডেন্টস ট্রফির শেষ রাউন্ডে এক ম্যাচে ৬৪ ও অপরাজিত ১১১ রানের ইনিংস আলী রাজ্জাকের জন্য নিঃসন্দেহে স্মরণীয় অর্জন। দলের কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যাট হাতে দায়িত্ব নেওয়া এবং দুটি গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, চাপ সামলে ইনিংস এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তাঁর রয়েছে। সামনে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁর অবস্থান আরও শক্ত হতে পারে। আবদুল রাজ্জাকের ছেলে হিসেবে পরিচিত আলী এখন নিজের ব্যাটের পারফরম্যান্স দিয়েই ক্রিকেটপ্রেমীদের মনোযোগ ধরে রাখতে চাইবেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com