প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টানা আট দিনের ছুটি শেষে আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর বেনাপোলে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে। পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজে যোগ দিয়েছেন শ্রমিকেরা, কর্মস্থলে ফিরেছেন বন্দর ও কাস্টমসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। দীর্ঘ বিরতির পর বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু হওয়ায় বন্দরের ভেতরে ব্যস্ততা বাড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে সীমান্তের দুই পাশে আটকে থাকা পণ্যবাহী ট্রাকের জটও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।
শারদীয় দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটির কারণে টানা আট দিন বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধ ছিল। এ সময়ে পণ্য পরিবহন ও খালাস কার্যক্রম থেমে থাকায় বন্দরের দুই পাশে জমতে থাকে পণ্যবাহী ট্রাক। কয়েক হাজার ট্রাক বন্দরে প্রবেশের অপেক্ষায় আটকে পড়ায় পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়। শনিবার সকালে কার্যক্রম চালু হওয়ার পর সেই জমে থাকা পণ্য সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
দীর্ঘ ছুটির পর বন্দর সচল হওয়ায় আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং শ্রমিকদের মধ্যে নতুন করে কর্মব্যস্ততা তৈরি হয়েছে। পণ্য খালাসের কাজ শুরু হওয়ায় একদিকে যেমন ট্রাক চলাচল স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে আমদানি করা পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানোর প্রক্রিয়াও আবার গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বন্দর এলাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকা যানবাহনগুলোর চাপ কমাতে এখন দ্রুত ও সমন্বিতভাবে কাজ করাই সংশ্লিষ্টদের প্রধান লক্ষ্য।
বেনাপোল বন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আলহাজ মহসিন মিলন জানান, টানা আট দিনের ছুটি শেষে শনিবার সকাল থেকে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, বন্দর ও কাস্টমসের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শ্রমিকেরা কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ছুটির কারণে সীমান্তের দুই পাশে পণ্যবাহী ট্রাকের জট তৈরি হয়েছিল। কয়েক হাজার ট্রাক বন্দরে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। পণ্য খালাস ও পরিবহন কার্যক্রম শুরু হওয়ায় সেই চাপ কমতে শুরু করেছে।
মহসিন মিলন বলেন, দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। দীর্ঘ বিরতির পর একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ট্রাকের পণ্য পরিবহন ও খালাসের প্রয়োজন দেখা দেওয়ায় বন্দরের কার্যক্রম পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা গুরুত্বপূর্ণ। পণ্য দ্রুত খালাস করা গেলে অপেক্ষমাণ যানবাহনের সংখ্যা কমবে এবং সীমান্তের দুই পাশে সড়কে চলাচলের চাপও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রুহুল আমিন জানান, শনিবার সকাল থেকে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পুনরায় চালু হয়েছে। ছুটিতে থাকা বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন। দীর্ঘ ছুটির কারণে তৈরি হওয়া যানজট ও পণ্যজট কমাতে দ্রুত পণ্য খালাসের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
বন্দর সচল হওয়ার বিষয়টি শুধু পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারত থেকে আমদানি করা কাঁচামাল, শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং অন্যান্য পণ্য দেশের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনকেন্দ্রে পৌঁছানোর জন্য বেনাপোলের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় আমদানি বন্ধ থাকলে এসব পণ্যের সরবরাহে বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়মিত আমদানির ওপর নির্ভর করে, তাদের পণ্য সংগ্রহ ও পরিবহনের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হতে পারে। বন্দর পুনরায় চালু হওয়ায় আটকে থাকা পণ্য ছাড় ও সরবরাহের পথ আবার খুলেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্থলপথে ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানি করা পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আসে। স্বাভাবিক সময়ে এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ ট্রাক পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। এই পরিমাণ বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কারণে বন্দরটির সঙ্গে দেশের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পণ্য সরবরাহব্যবস্থার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই কয়েক দিনের বিরতিও আমদানি-রপ্তানির সময়সূচি ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
দীর্ঘ ছুটির সময়ে পণ্যবাহী ট্রাকের অপেক্ষা বাড়লেও যাত্রী পারাপার বন্ধ ছিল না। বন্দরসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই আট দিন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের যাতায়াত স্বাভাবিক ছিল। অর্থাৎ পণ্য পরিবহন ও খালাস কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও দুই দেশের মানুষের সীমান্ত পারাপারে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি। এতে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের স্থবিরতা এবং যাত্রী চলাচলের ধারাবাহিকতার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের স্থলবাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। এই পথে পণ্য আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ট্রাকচালক, পরিবহনশ্রমিক, পণ্য ওঠানো-নামানোর শ্রমিক এবং বিভিন্ন সেবাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকলে তাঁদের অনেকের কাজ সাময়িকভাবে থেমে যায় বা সীমিত হয়ে পড়ে। আবার কার্যক্রম চালু হলে পণ্য খালাস, পরিবহন, কাগজপত্র যাচাই এবং সরবরাহের কাজ একসঙ্গে বাড়তে থাকে। ফলে বন্দর সচল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব পেশার মানুষের কর্মব্যস্ততাও ফিরে আসে।
তবে আট দিনের জমে থাকা কাজ দ্রুত শেষ করতে গিয়ে যেন নিরাপত্তা ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ঘাটতি না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পণ্য খালাসের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি কাস্টমসের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, নথিপত্র যাচাই এবং যানবাহন ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করতে হবে। অপেক্ষমাণ ট্রাকগুলোকে পর্যায়ক্রমে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুযোগ দেওয়া গেলে বন্দরের ভেতরে এবং আশপাশের সড়কে অপ্রয়োজনীয় চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয় এই পর্যায়ে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়ার পর দ্রুত পণ্য খালাস করা গেলে সীমান্তের দুই পাশে জমে থাকা ট্রাকের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। একই সঙ্গে আমদানি করা পণ্য দেশের গন্তব্যে পৌঁছানো এবং রপ্তানিপণ্য ভারতে পাঠানোর কাজেও গতি ফিরবে। তবে যানজট পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি। অপেক্ষমাণ ট্রাকের সংখ্যা, প্রতিদিনের খালাসের সক্ষমতা এবং পরিবহনব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে পরিস্থিতির উন্নতির গতি।
দীর্ঘ ছুটির পর বেনাপোল স্থলবন্দরের কার্যক্রম সচল হওয়া তাই দেশের সীমান্তবাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এখন দ্রুত পণ্য খালাস, ট্রাক চলাচল স্বাভাবিক করা এবং আমদানি-রপ্তানির নিয়মিত ছন্দ ফিরিয়ে আনাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে আটকে থাকা পণ্য সরবরাহের গতি বাড়বে এবং বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বস্তি ফিরতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত