প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কানাডা থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা উচিত কি না, সেই প্রশ্নে গণভোট আয়োজন করেছে দেশটির তেলসমৃদ্ধ প্রদেশ আলবার্টা। সোমবার অনুষ্ঠিত এই ভোটের ফল বাধ্যতামূলক নয়। জনমত জরিপে অধিকাংশ বাসিন্দা কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দেওয়ায় বিচ্ছিন্নতার সমর্থকেরা গণভোটে পিছিয়ে পড়তে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ভোটে স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন কম থাকলেও দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন থেমে যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অর্থনৈতিক অসন্তোষ, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সঙ্গে মতবিরোধ এবং তেলশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগকে ঘিরে আলবার্টার রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের চেয়ে আয়তনে সামান্য ছোট আলবার্টায় প্রায় ৫০ লাখ মানুষের বসবাস। কানাডার জ্বালানি খাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই প্রদেশ দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু প্রদেশটির একাংশের মানুষের অভিযোগ, বিপুল অর্থনৈতিক অবদান থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিনির্ধারণে আলবার্টার স্বার্থ যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। বিশেষ করে পরিবেশনীতি, তেল ও গ্যাসশিল্পের ওপর বিধিনিষেধ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজস্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থের টানাপোড়েন বিচ্ছিন্নতার দাবিকে উসকে দিচ্ছে।
আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমর্থকেরা মনে করেন, প্রদেশটির উৎপাদন ও জ্বালানি খাত থেকে বিপুল অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হলেও কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিতে অন্য অঞ্চলগুলো তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, পরিবেশগত বিধিনিষেধ তেলশিল্পের সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই অসন্তোষ থেকেই কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার দাবিকে আরও সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে।
আলবার্টাকে স্বাধীন করার পক্ষে প্রচার চালানো সংগঠন ‘পাথওয়ে টু ইনডিপেনডেন্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা কোরি মরগান মনে করেন, কানাডার বর্তমান ব্যবস্থায় উৎপাদনকারী প্রদেশগুলোর স্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকার ও জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি এমন অঞ্চলগুলো সুবিধা পায়, অথচ আলবার্টার মতো উৎপাদননির্ভর প্রদেশকে তুলনামূলক বেশি ব্যয় বহন করতে হয়। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এই বক্তব্য প্রদেশটির অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।
তবে আলবার্টার সব বাসিন্দা স্বাধীনতার পক্ষে নন। শুক্রবার প্রকাশিত অ্যাঙ্গাস রিডের এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রদেশটির ৬৬ শতাংশ বাসিন্দা কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দিতে চান। জরিপে অংশ নেওয়া বাসিন্দাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়ে বাধ্যতামূলক গণভোট হলে স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মধ্যেও সবাই স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন না। জরিপে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে থাকা ভোটারদের ৬০ শতাংশ বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকারকে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়াই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য। স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা চান ৩৭ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, আলবার্টায় বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নটি শুধু স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ এবং প্রদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার দাবিও এ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেকের কাছে গণভোট হতে পারে অটোয়ার প্রতি চাপ তৈরির একটি রাজনৈতিক মাধ্যম। ফলে স্বাধীনতার পক্ষে চূড়ান্ত জনসমর্থন না থাকলেও এই ইস্যু প্রাদেশিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে যেতে পারে।
ক্যালগারির মাউন্ট রয়্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডুয়েন ব্র্যাট মনে করেন, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনটি এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখান থেকে একে সহজে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, আন্দোলনের সমর্থকেরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও সংগঠন গড়ে তুলেছেন। ফলে গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে প্রত্যাশিত ফল না এলেও আন্দোলনটি রাজনৈতিক আলোচনায় টিকে থাকতে পারে।
আলবার্টার মুখ্যমন্ত্রী ড্যানিয়েল স্মিথের অবস্থানও এ বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রদেশটির বাসিন্দাদের কানাডার সঙ্গে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তাঁর নিজের দল ইউনাইটেড কনজারভেটিভ পার্টির একটি ছোট কিন্তু সোচ্চার অংশের চাপের মুখে বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। কয়েক দশক ধরে আলবার্টায় কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার দাবি থাকলেও এবারই প্রথম কোনো প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে ভোটারদের মতামত জানতে গণভোটের আয়োজন করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্মিথ বলেছেন, গণভোটে অধিকাংশ ভোটার আলাদা হওয়ার পক্ষে মত দিলে তিনি বিচ্ছিন্নতার বিষয়ে একটি বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ নেবেন। অর্থাৎ সোমবারের ভোটের ফল সরাসরি স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করবে না। বরং এর ফল ভবিষ্যতে আরও আনুষ্ঠানিক ও গুরুত্বপূর্ণ ভোট আয়োজনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি করবে কি না, তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আলবার্টাকে দেশটির সঙ্গে রাখার পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন। আলবার্টায় বেড়ে ওঠা কার্নি গত সপ্তাহের বেশির ভাগ সময় প্রদেশটির বাসিন্দাদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন এবং গণভোটে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি কানাডার জাতীয় ঐক্য ও গর্ববোধের ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, দেশকে শুধু কোন প্রদেশ কতটা অর্থনৈতিক সুবিধা পেল বা কতটা ব্যয় বহন করল—সেই হিসাবের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত নয়।
শুক্রবার আলবার্টার রেড ডিয়ারে বক্তব্য দেওয়ার সময় কার্নি কানাডাকে বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে কেবল লাভ-ক্ষতির হিসাবের সম্পর্ক হিসেবে দেখার বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্যে দেশের ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের গুরুত্ব উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বিষয়ে বারবার বক্তব্য দেওয়ার প্রেক্ষাপটে কার্নি জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষাকে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন।
আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব কমাতে কেন্দ্রীয় সরকারও কিছু নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্নি কিছু পরিবেশনীতি বাতিল করেছেন এবং একটি প্রস্তাবিত তেল পাইপলাইন নির্মাণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। পাইপলাইনটি নির্মিত হলে আলবার্টা থেকে এশিয়ার বাজারে তেল রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। জ্বালানি খাতের স্বার্থ ও পরিবেশগত নীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পারলে প্রদেশটির সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
গণভোটের দিন ভোটগ্রহণের সময় নিয়েও জটিলতা দেখা দেয়। স্থানীয় সময় রাত ৮টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কিছু ভোটকেন্দ্র নির্ধারিত সময়ে খোলা না যাওয়ায় সেখানে ভোট দেওয়ার সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় আলবার্টার নির্বাচন কর্তৃপক্ষ। এডমন্টনের একটি ভোটকেন্দ্রে স্থানীয় সময় রাত ১০টা পর্যন্ত ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল। সব ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ করা হবে না বলেও জানানো হয়। ফলে ভোটের ফল প্রকাশের সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
কানাডার ইতিহাসেও এই গণভোট বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ফরাসিভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ কুইবেক প্রদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন রয়েছে, যার পেছনে ভাষা ও সংস্কৃতিগত স্বাতন্ত্র্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আলবার্টার ক্ষেত্রে স্বাধীনতার দাবি মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থ, জ্বালানি নীতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ক্ষমতা ও সম্পদ বণ্টনের বিরোধকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। ফলে দুটি প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পেছনের কারণ এক নয়।
আলবার্টার স্বাধীনতাপন্থী সংগঠনগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে কীভাবে দেশ পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনার কথা বলেছে। তবে প্রতিরক্ষা, মুদ্রা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। স্বাধীনতার দাবিকে বাস্তব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দিতে হলে এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও জনসমর্থন প্রয়োজন হবে।
সোমবারের গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন প্রত্যাশার চেয়ে কম হলেও আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ভবিষ্যতে কোন পথে এগোবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সমর্থকেরা আরও একটি বাধ্যতামূলক গণভোটের দাবিতে সংগঠিত হতে পারেন, আবার আলাদা রাজনৈতিক দল গঠনের পথও বেছে নিতে পারেন। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে জনমত, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিগত পদক্ষেপ এবং আলবার্টার অর্থনৈতিক অসন্তোষ কতটা কমানো যায়, তার ওপর।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত