জ্বালানি নিরাপত্তায় সৌদি-কাতারের সহায়তা চায় বাংলাদেশ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৭ বার
জ্বালানি নিরাপত্তায় সৌদি-কাতারের সহায়তা চায় বাংলাদেশ

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণ, দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে সৌদি আরব ও কাতারের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দেশে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, স্থলভাগ ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যতের জ্বালানি চাহিদা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে মধ্যপ্রাচ্যের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্যোগকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রোববার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি ফোরামের (আইইএফ) ১৭তম সম্মেলনের সাইডলাইনে এসব আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সৌদি আরবের বিদ্যুৎবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী নাসের আল কাহতানি, কাতারের জ্বালানিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ শেরিদা আল-কাবি এবং এসিডব্লিউএ পাওয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সামির জে সেরহানের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। সোমবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে কলকারখানা সচল রাখা, সার উৎপাদন এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ প্রয়োজন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন কিংবা আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করতে পারে। এ বাস্তবতায় নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যময় করার উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সৌদি আরবের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের ২০৩০ সালের জ্বালানিবিষয়ক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহযোগিতা চেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। জবাবে সৌদি আরবের বিদ্যুৎবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী নাসের আল কাহতানি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতা আরও জোরদারের আশ্বাস দিয়েছেন বলে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রতিনিধি বিনিময় এবং সমঝোতার একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেওয়া হয়। পাশাপাশি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, গ্যাস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের সহযোগিতার গুরুত্ব রয়েছে একাধিক কারণে। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা বিভিন্ন খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, সার উৎপাদন এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গ্যাসের ব্যবহার থাকায় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে উৎপাদন ও পরিষেবায় প্রভাব পড়তে পারে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন এবং আমদানির মাধ্যমে চাহিদা পূরণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা তাই জ্বালানি পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কাতারের সঙ্গে বৈঠকেও বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কাতারের জ্বালানিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাবির সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা, বর্তমান এলএনজি আমদানি ব্যবস্থা এবং নতুন দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির সম্ভাবনা উঠে আসে। কাতারএনার্জির আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা থেকে এলএনজি সংগ্রহের পাশাপাশি আমদানির উৎস ও পরিবহনপথ বৈচিত্র্যময় করার বিষয়েও দুই পক্ষ আলোচনা করে।

কাতার বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি বাজারের জন্য কাতারের সঙ্গে কার্যকর বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় ধরে গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা করা গেলে ভবিষ্যৎ চাহিদা পরিকল্পনা এবং আমদানি ব্যবস্থাপনা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। তবে এ ধরনের চুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করে মূল্য নির্ধারণের শর্ত, সরবরাহের পরিমাণ, চুক্তির মেয়াদ, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বাণিজ্যিক সমঝোতার ওপর।

বৈঠকে কাতারএনার্জির আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা থেকে এলএনজি সংগ্রহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক ও কারিগরি আলোচনা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে আলোচনাকে সম্ভাব্য সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা গেলেও চূড়ান্ত চুক্তি, সরবরাহের পরিমাণ কিংবা মূল্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের জন্য পরবর্তী অগ্রগতির অপেক্ষা করতে হবে।

এলএনজি আমদানির পাশাপাশি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়টিও বাংলাদেশের জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করা তরলীকৃত গ্যাস গ্রহণ, সংরক্ষণ এবং পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ক্ষেত্রে এ ধরনের টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নতুন টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে আমদানি করা গ্যাস গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর জন্য প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, অর্থায়ন, পরিবেশগত বিবেচনা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু জীবাশ্ম জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করাই নয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টিও রিয়াদের বৈঠকগুলোতে গুরুত্ব পেয়েছে। এ বিষয়ে এসিডব্লিউএ পাওয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সামির জে সেরহানের সঙ্গে আলোচনা করেন বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রী। বৈঠকে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমানো এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনেও সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। তবে বিনিয়োগের আগ্রহকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে জমির প্রাপ্যতা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো, প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা, বিনিয়োগের শর্ত এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি তাই কেবল আমদানি বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা, নবায়নযোগ্য উৎসের সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। সৌদি আরব ও কাতারের সঙ্গে আলোচনায় এসব বিষয়ের বিভিন্ন দিক উঠে আসায় বাংলাদেশের জ্বালানি কূটনীতিতে বহুমুখী সহযোগিতার সম্ভাবনা সামনে এসেছে।

সৌদি আরবের সঙ্গে বৈঠকের শুরুতে রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শোক প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি হামলার নিন্দা জানান এবং নিহত দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পাঠানো ও আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সৌদি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন। এ প্রসঙ্গ বৈঠকের জ্বালানিবিষয়ক আলোচনার পাশাপাশি সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসে।

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা, আহতদের চিকিৎসা এবং নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার মতো বিষয় প্রবাসী পরিবারগুলোর জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় জরুরি হয়ে ওঠে। জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি বিষয়টি উত্থাপন করায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অর্থনৈতিক দিকের সঙ্গে নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মানবিক স্বার্থও গুরুত্ব পেয়েছে।

রিয়াদে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্য এবং সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তবে এসব আলোচনার ভিত্তিতে নতুন কোনো জ্বালানি চুক্তি স্বাক্ষর, বিনিয়োগের নির্দিষ্ট অঙ্ক নির্ধারণ কিংবা টার্মিনাল নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়নি।

সব মিলিয়ে সৌদি আরব ও কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আলোচনা জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা, আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা, নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। এখন এসব আলোচনাকে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ দিতে কারিগরি মূল্যায়ন, বাণিজ্যিক সমঝোতা এবং কার্যকর নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি ও নতুন বিনিয়োগের বিষয়ে অগ্রগতি হলে তা বাংলাদেশের জ্বালানি পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সুফল নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত, ব্যয়, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা এবং দেশের সামগ্রিক জ্বালানি চাহিদার সঙ্গে প্রকল্পগুলোর সামঞ্জস্যের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com