পুলিশ একা চলতে পারে না কেন, প্রশ্ন গোলাম পরওয়ারের

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
পুলিশ একা চলতে পারে না কেন, প্রশ্ন গোলাম পরওয়ারের

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা অবনতি হলে পুলিশ সদস্যদের একাকী চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিতে হয়। তাঁর অভিযোগ, সরকার জনগণের যৌক্তিক দাবি মোকাবিলা না করে ভিন্ন বিষয় সামনে এনে আন্দোলনের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে তাঁর এসব বক্তব্য রাজনৈতিক দলের একজন শীর্ষ নেতার অভিযোগ ও মূল্যায়ন; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য ও পরিসংখ্যানও গুরুত্বপূর্ণ।

রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে যশোর প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। আগামী ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় ‘খুলনা-যশোর-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লং মার্চ’-এর প্রস্তুতি সম্পর্কে জানাতে এই সভার আয়োজন করা হয়। জামায়াতে ইসলামীর এই নেতা জানান, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের দাবিতে ১১ দলের উদ্যোগে এ কর্মসূচি আয়োজন করা হচ্ছে।

সভায় গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ। তিনি বলেন, খুলনায় পুলিশের একাকী চলাচলে নিষেধ করা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, পরিস্থিতি কতটা খারাপ হলে পুলিশ সদস্যদের একা চলাচল না করার নির্দেশ দিতে হয়। সরকারের প্রতি তাঁর আহ্বান, অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য ও রাজনৈতিক বিতর্কে সময় ব্যয় না করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

পুলিশের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নাগরিক নিরাপত্তা রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে খুলনায় পুলিশ সদস্যদের একাকী চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার নির্দিষ্ট কারণ, নির্দেশনার পরিধি এবং কোন পরিস্থিতিতে তা জারি করা হয়েছে—এসব বিষয়ে সভায় বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসনের ব্যাখ্যা ও প্রাসঙ্গিক তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সরকার জনগণের দাবির জবাব না দিয়ে নানা ধরনের আশঙ্কা ও রাজনৈতিক বক্তব্য সামনে আনছে। তাঁর ভাষ্য, ১১ দলের লং মার্চের সঙ্গে পতিত সরকারের ফিরে আসার আশঙ্কা যুক্ত করে সরকার নতুন ধরনের রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করছে। তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনের গুরুত্ব থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে নিতে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, জনগণকে ভয় দেখিয়ে যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করার চেষ্টা সফল হবে না।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে জনগণের মতামতকে কীভাবে কার্যকর সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়া হবে, সে প্রশ্ন। গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। তবে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন বলতে কোন নির্দিষ্ট পদক্ষেপ, সিদ্ধান্ত বা প্রক্রিয়াকে বোঝানো হচ্ছে, তা সভায় বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান, সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামো এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার অগ্রগতি জানা গেলে বিতর্কের পূর্ণ চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।

জামায়াতের এই নেতা সরকারি দলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোকজনকে বসানোর অভিযোগও করেন। তাঁর দাবি, যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক, সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এমনকি বিএনপির লোক ছাড়া কেউ সারের ডিলার পাননি বলেও তিনি অভিযোগ তোলেন। এসব অভিযোগের পক্ষে সভায় বিস্তারিত নথি বা নির্দিষ্ট উদাহরণ উপস্থাপনের কথা উল্লেখ করা হয়নি। তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট নিয়োগপ্রক্রিয়া, ডিলার নিয়োগের নীতিমালা এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।

গোলাম পরওয়ার বলেন, ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল বিরোধী দলের কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা সব সময় বুঝতে পারে না। তাঁর মতে, জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা বাস্তবায়ন না করলে বিরোধী দলকে আন্দোলনের পথে যেতে হয়। তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক যুক্তি দিয়ে বিরোধী দলকে মোকাবিলা করা সম্ভব না হলে অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য সামনে আনা হয়। তাঁর এই মন্তব্যে সরকারের সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সম্পর্ক এবং আন্দোলনের অধিকার নিয়ে চলমান রাজনৈতিক মতপার্থক্যের প্রতিফলন দেখা যায়।

লং মার্চের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, কর্মসূচির মাধ্যমে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবি তুলে ধরা হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগকে আন্দোলনের অন্যতম বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। খাদ্যপণ্য, যাতায়াত এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যয় বেড়ে গেলে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের পরিবারের বাজেটে চাপ পড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মূল্যস্থিতিশীলতা ও বাজার তদারকির দাবি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গুরুত্ব পাওয়া স্বাভাবিক। তবে কোন পণ্যের দাম কতটা বেড়েছে কিংবা জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ে কী ধরনের নির্দিষ্ট পরিবর্তন দাবি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সভায় বিস্তারিত পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।

আগামী ৩১ অক্টোবরের লং মার্চ শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজনের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি জানান, এর আগে ১১ দলীয় জোটের অধীনে দুটি লং মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাঁর দাবি অনুযায়ী, সেগুলো শান্তিপূর্ণ ছিল। এবারের কর্মসূচিতেও একই ধরনের পরিবেশ বজায় রাখার আশ্বাস দেন তিনি। পাশাপাশি লং মার্চের কারণে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে সাময়িক যাতায়াতের অসুবিধা ও চলাচলে ভোগান্তি হতে পারে বলে স্বীকার করে ব্যবসায়ী, পথচারী এবং সাধারণ মানুষের কাছে আগাম দুঃখ প্রকাশ করেন।

কর্মসূচির পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানান, নির্ধারিত দিনে সকাল ৮টায় ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকা থেকে সংক্ষিপ্ত জনসভার মাধ্যমে লং মার্চ শুরু হবে। এরপর পদ্মা সেতু হয়ে প্রায় এক হাজার গাড়ির বহর নিয়ে কুষ্টিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ১২ ঘণ্টার দীর্ঘ এই পথযাত্রায় গণমাধ্যমকর্মী, চিকিৎসক, শিল্পী এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এত বড় বহর সড়কে চলাচল করলে যানবাহনের স্বাভাবিক প্রবাহে সাময়িক চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণে আয়োজকদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

রাজনৈতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে জনসমর্থন প্রদর্শনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচল ও দৈনন্দিন কাজের ওপর প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দীর্ঘ পথের লং মার্চে জরুরি সেবা, অ্যাম্বুলেন্স, পণ্যবাহী যানবাহন এবং কর্মস্থলে যাতায়াতকারী মানুষের চলাচল যেন অযথা ব্যাহত না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। গোলাম পরওয়ারের আগাম দুঃখ প্রকাশকে এ ধরনের সম্ভাব্য অসুবিধার স্বীকৃতি হিসেবে দেখা যায়। তবে বাস্তবে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কী ধরনের সমন্বয় করা হবে, তা আয়োজকদের পরবর্তী ঘোষণা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করবে।

যশোরে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় জেলা জামায়াতের আমির গোলাম রসূল, সংসদ সদস্য মোক্তার আলী, গাজী এনামুল হক এবং ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলার জামায়াতের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় লং মার্চের প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক দাবিগুলো তুলে ধরা হয়।

গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা, গণভোটের রায়, দ্রব্যমূল্য এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগ একসঙ্গে সামনে এসেছে। এসব বিষয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নও প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখা—এসব বিষয় সরাসরি জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত। একইভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।

আগামী ৩১ অক্টোবরের লং মার্চে কত মানুষ অংশ নেবেন, কর্মসূচির পথজুড়ে কী ধরনের জনসমাগম হবে এবং সংশ্লিষ্ট দাবিগুলোর বিষয়ে সরকার কী প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এই কর্মসূচিকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব প্রশ্নের সমাধানে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য তথ্য, কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com