প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় থাকার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জননিরাপত্তা এবং চাকরিতে নিয়োগ-বাণিজ্য ও দুর্নীতির প্রতিবাদে ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। এসব কর্মসূচির অংশ হিসেবে সপ্তাহব্যাপী লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগের পাশাপাশি ঢাকার শাহবাগে প্রতিবাদ সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দলটির সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলামোটরে রূপায়ণ ট্রেড সেন্টারে এনসিপির দলীয় কার্যালয়ে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। সভা সঞ্চালনা করেন এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। পরে দলের মিডিয়া সেলের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সভার সিদ্ধান্তগুলো জানানো হয়।
দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার বিষয়টি সভার গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হিসেবে উঠে আসে। দলটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পূজার সময় কেন্দ্রীয় কমিটি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থাকবেন। দলের শীর্ষ নেতারা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। এর মাধ্যমে উৎসবের পরিবেশ বজায় রাখা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে দলটির বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশে দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বহু এলাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পূজামণ্ডপ ঘিরে মানুষের সমাগম, পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় এবং স্থানীয় পর্যায়ে সম্মিলিত আয়োজন উৎসবের পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। এ সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আয়োজক, রাজনৈতিক সংগঠন ও স্থানীয় জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এনসিপির ঘোষিত কর্মসূচিতে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের বিষয়টি সেই সামাজিক সংযোগের দিকটিকেই সামনে এনেছে।
তবে উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের। রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, সম্প্রীতির বার্তা প্রচার এবং কোনো সমস্যার বিষয়ে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে পূজামণ্ডপ ও উৎসবস্থলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো এবং গুজব বা উসকানিমূলক তথ্য ছড়িয়ে পড়া রোধ করাও গুরুত্বপূর্ণ। এনসিপির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, তা বাস্তবায়নের সময় এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।
দুর্গাপূজাকেন্দ্রিক উদ্যোগের পাশাপাশি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের প্রতিবাদ জানাতে চায় দলটি। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি, জননিরাপত্তা এবং চাকরিতে নিয়োগ-বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে কর্মসূচি পালন করা হবে। এসব বিষয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে আগামী ২৩ অক্টোবর থেকে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন স্থানে সপ্তাহব্যাপী লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন নাহিদ ইসলাম।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম বাড়লে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে সংসারের ব্যয় সামলাতে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচের মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে মানুষকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ কারণে নিত্যপণ্যের দাম এবং জ্বালানি ব্যয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও কর্মসূচি জনআলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। তবে মূল্যবৃদ্ধির কারণ, বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা জনস্বার্থে প্রয়োজন।
নিয়োগ-বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগও কর্মসূচির অন্যতম বিষয়। চাকরিপ্রার্থীদের কাছে স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম বা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠলে চাকরিপ্রার্থীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং যোগ্য প্রার্থীদের সুযোগ পাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এনসিপি এসব বিষয় নিয়ে গণসংযোগের মাধ্যমে জনমত গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে।
ঘোষিত কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় আগামী ৩০ অক্টোবর ঢাকার শাহবাগে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করবে এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের দাম, জননিরাপত্তা এবং নিয়োগ-বাণিজ্য ও দুর্নীতির মতো ইস্যুতে দলের অবস্থান তুলে ধরাই এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য বলে সভার সিদ্ধান্তে জানানো হয়েছে। তবে কর্মসূচির ধরন, অংশগ্রহণকারীর সম্ভাব্য সংখ্যা কিংবা নির্দিষ্ট সময়সূচি সম্পর্কে বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।
রাজনৈতিক পর্ষদের সভায় দলটির সাংগঠনিক বিষয়েও একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটির পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন নেতার মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের কাজ চূড়ান্ত করে ১৩ অক্টোবরের মধ্যে নতুন কমিটি ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে। দলীয় কাঠামো পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গোছানো এবং দায়িত্ব বণ্টন স্পষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়। তবে নতুন কমিটিতে কারা কোন দায়িত্ব পাবেন, সে বিষয়ে সভার বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখেও প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এনসিপি আগামী সপ্তাহে আরও ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভার নির্বাচনে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করার পরিকল্পনা জানিয়েছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য প্রার্থী তালিকা তৈরির কাজও জোরদার করা হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সেবা, স্থানীয় অবকাঠামো, নাগরিক সুবিধা এবং এলাকার উন্নয়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে এসব নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি দলটির স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
সভায় এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ আল আমিন ও নুসরাত তাবাসসুম উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা সারজিস আলম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, আরিফুল ইসলাম আদীব, সারোয়ার তুষার, আলী আহসান জুনায়েদ ও সালেহউদ্দিন সিফাতসহ অন্য নেতারা সভায় অংশ নেন।
দুর্গাপূজায় সম্প্রীতি রক্ষা, জনজীবনের ব্যয়সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে কর্মসূচি ঘোষণার মধ্য দিয়ে এনসিপি ধর্মীয় ও নাগরিক—দুই ধরনের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়কে সামনে এনেছে। এখন ঘোষিত উদ্যোগগুলো মাঠপর্যায়ে কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, পূজামণ্ডপে তাদের উপস্থিতি কতটা কার্যকর হয় এবং জনস্বার্থের দাবিতে গণসংযোগ ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে মানুষের অংশগ্রহণ কেমন থাকে, তা পর্যবেক্ষণের বিষয়। একই সঙ্গে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের ঘোষণাও আগামী দিনের রাজনৈতিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত