প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পূর্ব আফ্রিকার দেশ জিবুতির উপকূলে অভিবাসীবাহী নৌকাডুবির ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। ইয়েমেনের উদ্দেশে যাত্রা করা নৌকাটিতে ৩০০ জনের বেশি মানুষ ছিলেন। অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণে উপকূলের কাছাকাছি এসে নৌকাটি ডুবে যায় বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে এখনো ৮৪ জন নিখোঁজ থাকায় প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু এবং বহু যাত্রীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় অভিবাসনপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় ৩০৫ জন যাত্রী নিয়ে নৌকাটি জিবুতি থেকে ইয়েমেনের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরই উপকূলের কাছাকাছি নৌকাটি দুর্ঘটনার শিকার হয়। নৌকাটিতে বিপুলসংখ্যক যাত্রী থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এখন পর্যন্ত ১৩৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করে দাফন করা হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতা চললেও সাগরে তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ৮০ জনের বেশি মানুষকে আইওএমের উদ্ধারকেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাঁদের চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া সবাই ইথিওপিয়ার নাগরিক বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এত বড় একটি দুর্ঘটনার পর বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিকভাবে সামলে ওঠার সুযোগ করে দেওয়া জরুরি। কারণ, তাঁদের অনেকেই একই নৌকায় থাকা পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিত মানুষকে হারিয়েছেন। কেউ কেউ এখনো জানেন না, নিখোঁজ স্বজনেরা বেঁচে আছেন কি না। এমন অনিশ্চয়তা উদ্ধারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের শোক ও মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
জিবুতিতে আইওএমের মিশনপ্রধান আলেক্সান্ডার কোইসাক জানিয়েছেন, একসঙ্গে বহু মরদেহ উপকূলে ভেসে আসায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় অনেককে নাম-পরিচয় ছাড়াই গণকবরে দাফন করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি দুর্ঘটনার মানবিক বিপর্যয়কে আরও গভীর করে তুলেছে। মরদেহ শনাক্ত করা না গেলে পরিবারের সদস্যদের পক্ষে প্রিয়জনের মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া, শেষ বিদায় জানানো কিংবা প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নিখোঁজদের সংখ্যা ৮৪ বলে জানানো হলেও তাঁদের প্রত্যেকের পরিণতি সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত তথ্য নেই। উদ্ধার অভিযান ও পরবর্তী অনুসন্ধানের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে তাঁদের বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় কি না। একই সঙ্গে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং তাঁদের পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বড় ধরনের অভিবাসী দুর্ঘটনায় ভুক্তভোগীদের জাতীয়তা, পরিচয় ও পরিবারের যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করা অনেক সময় জটিল হয়ে পড়ে। এ কারণে উদ্ধারকারী সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন এবং মানবিক সহায়তাকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
জিবুতি ও ইয়েমেনের মধ্যবর্তী এই সমুদ্রপথ আফ্রিকার শিং অঞ্চল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজের সন্ধানে যাওয়া অভিবাসীদের কাছে পরিচিত একটি রুট। ইথিওপিয়া ও আশপাশের অঞ্চলের অনেক মানুষ উন্নত জীবিকা, নিয়মিত আয় এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় এই পথে যাত্রা করেন। তাঁদের অনেকে ইয়েমেন হয়ে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু এই যাত্রায় অনিরাপদ নৌযান, অতিরিক্ত যাত্রী, বিপজ্জনক সমুদ্র পরিস্থিতি এবং মানবপাচারকারীদের শোষণের ঝুঁকি রয়েছে। জীবিকার সন্ধানে যাত্রা শুরু করা মানুষদের জন্য এই পথ কখনো কখনো প্রাণঘাতী বিপর্যয়ে পরিণত হয়।
অভিবাসনের পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। নিজ দেশে কাজের সীমিত সুযোগ, কম আয়, পরিবারের ভরণপোষণের চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রত্যাশা অনেক মানুষকে দূরদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে। তাঁদের কাছে বিদেশে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা পরিবারের জীবন বদলে দেওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা দিতে পারে। কিন্তু নিরাপদ ও বৈধ পথে যাত্রার সুযোগ সীমিত হলে কেউ কেউ অনিশ্চিত যাত্রার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। এতে তাঁরা শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়েন না, বরং প্রতারণা, শোষণ, আটক কিংবা নিখোঁজ হওয়ার আশঙ্কারও মুখোমুখি হন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরও আফ্রিকার শিং অঞ্চল থেকে ইয়েমেনমুখী এই অভিবাসন রুটে ৯০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন। এ পরিসংখ্যান দেখায়, জিবুতি ও ইয়েমেনের মধ্যবর্তী পথের ঝুঁকি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিতভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ এই পথ ব্যবহার করায় সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা কমানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতা জরুরি হলেও ভবিষ্যতে একই ধরনের প্রাণহানি ঠেকাতে যাত্রার আগের নিরাপত্তা, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা এবং পাচারবিরোধী উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আইওএমের মহাপরিচালক অ্যামি পোপ এই প্রাণহানিকে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের পথ না থাকায় মানুষ জীবন ঝুঁকিতে ফেলে এভাবে সমুদ্রযাত্রা করছে। পরবর্তী দুর্ঘটনা ঘটার আগেই অভিবাসীদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্বনেতাদের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে নিরাপদ অভিবাসনপথ তৈরি, ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সুরক্ষা এবং অনিয়মিত ও বিপজ্জনক যাত্রার পেছনের কারণ মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বা দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান যথেষ্ট নয়। সম্ভাব্য অভিবাসীদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য, বৈধভাবে বিদেশে কাজের সুযোগ, প্রতারণা থেকে সুরক্ষা এবং মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যাঁরা বিপজ্জনক পথে যাত্রা শুরু করেছেন, তাঁদের উদ্ধার ও চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকা জরুরি। নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনুসন্ধান, মরদেহ শনাক্তকরণ এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জিবুতির এই দুর্ঘটনা আরও একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে এনেছে—কাজের সন্ধানে দেশ ছাড়তে গিয়ে বহু মানুষ এমন ঝুঁকি নিচ্ছেন, যার পরিণতি হতে পারে মৃত্যু কিংবা দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা। পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা করা ব্যক্তিদের অনেকেই আর ফিরে আসেন না; তাঁদের স্বজনদের অপেক্ষা পরিণত হয় উদ্বেগ ও শোকে। বিশেষ করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে কোনো নিশ্চিত খবর না পেলে তাঁদের মানসিক ও সামাজিক দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো নিখোঁজ ৮৪ জনের বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং নিহতদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা জোরদার করা। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি ও নৌযাত্রার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকাতে অভিবাসীদের নিরাপদ ও বৈধ পথে যাত্রার সুযোগ বাড়ানো এবং বিপজ্জনক রুটে তাঁদের জীবন রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় কাজের সন্ধানে যাত্রা করা মানুষের জন্য সমুদ্রপথের এই ভয়াবহ ঝুঁকি আরও বহু পরিবারকে শোকের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত