প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ধারণে বৈঠকে বসেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে কমিশন সভা শুরু হয়। পরীক্ষার সময়সূচি, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সম্ভাব্য নির্বাচনী সময়সূচি চূড়ান্ত করার বিষয়ে এই বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য আগে একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনায় কয়েকটি ধাপে ভোট আয়োজনের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা এবং সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া পরামর্শের কারণে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন আয়োজন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে কমিশনকে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় পরীক্ষার কারণে ওই দুই মাসে ভোট না করার পরামর্শ আসে। পরবর্তী সময়ে আগামী বছরের ৬ জুনের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন শেষ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বৈঠকে ঐকমত্য হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাতটি ধাপে আয়োজনের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। প্রথম ধাপের সম্ভাব্য তারিখ ছিল ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপের ১৩ ডিসেম্বর এবং তৃতীয় ধাপের ৩০ ডিসেম্বর। পরবর্তী ধাপগুলোর সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল ও ২৭ মে। তবে এই তারিখগুলো ছিল নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক পরিকল্পনার অংশ। কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আনুষ্ঠানিক তফসিল প্রকাশের আগে এগুলোকে নিশ্চিত নির্বাচনী তারিখ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে একাধিক ধাপে ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা করা হলে প্রতিটি ধাপের জন্য প্রশাসনিক প্রস্তুতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা, নির্বাচনী সরঞ্জাম সরবরাহ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সমন্বয় নিশ্চিত করতে হয়। ইউনিয়ন পরিষদের মতো তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচনে দেশের বিপুলসংখ্যক ভোটার অংশ নেন। তাই নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ধারণের সময় শুধু ভোটের তারিখ বিবেচনা করলেই হয় না; ভোটারদের অংশগ্রহণের পরিবেশ, প্রার্থীদের প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এবারের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে আলোচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে বিভিন্ন পরীক্ষা থাকায় ওই সময়ে নির্বাচন আয়োজন করলে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি ও পরীক্ষার কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় করতে হতে পারে। নির্বাচন এবং পরীক্ষা একই সময়ে হলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, ভোটার ও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে সরকারের পক্ষ থেকে পরীক্ষার সময় বিবেচনায় নিয়ে ভোটের সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে পরীক্ষার সঙ্গে নির্বাচনের সময় সমন্বয় করার অর্থ কেবল দুটি কার্যক্রমকে আলাদা রাখা নয়। নির্বাচনের আগে প্রার্থী ও ভোটারদের প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ায় এর প্রস্তুতি ও প্রচার কার্যক্রমে বহু মানুষ সম্পৃক্ত থাকেন। সময়সূচি নির্ধারণে এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হলে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো সম্ভব হতে পারে।
ইউনিয়ন পরিষদ বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার তৃণমূল পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। গ্রামীণ এলাকার নাগরিক সেবা, স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম, বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি এবং জনগণের সঙ্গে প্রশাসনের যোগাযোগে ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা রয়েছে। পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন নানা সমস্যা ও উন্নয়নসংক্রান্ত প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নয়; স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে আলোচনা চলার সময়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যেও প্রস্তুতির বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ, মনোনয়ন জমা, যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং প্রচারের সময়সীমা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এসব বিষয় নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিলের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে। তাই প্রার্থী, ভোটার ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষগুলোর জন্য কমিশনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুসরণ করা জরুরি।
একই সঙ্গে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও আস্থার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন, প্রার্থীরা যাতে সমান সুযোগ পান এবং নির্বাচনী দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হয়, সে জন্য পরিকল্পিত প্রস্তুতি প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকলে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হয়। ভোটের সময়সূচি নির্ধারণের পর এসব প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখা কমিশনের অন্যতম বিবেচ্য বিষয় হতে পারে।
প্রাথমিক পরিকল্পনায় সাত ধাপে নির্বাচন আয়োজনের যে সম্ভাবনা উঠে এসেছে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও প্রশাসনিক প্রয়োজনও বিবেচনায় নিতে হবে। বিভিন্ন এলাকার ভোটগ্রহণ একসঙ্গে না করে ধাপে ধাপে আয়োজন করলে জনবল ও সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় সুবিধা হতে পারে। তবে কোন কোন ইউনিয়নে কোন ধাপে ভোট হবে, কতটি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে এবং কোন তারিখে ভোটগ্রহণ হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় আগামী বছরের ৬ জুনের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ করার বিষয়ে ঐকমত্যের তথ্য সামনে আসায় সময়সূচি নির্ধারণের আলোচনায় একটি সম্ভাব্য সময়সীমা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সময়সীমার মধ্যে নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, কমিশন কতটি ধাপে ভোট আয়োজন করবে এবং প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত তারিখগুলো কতটা পরিবর্তিত হবে, তা কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। বর্তমান বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের বৈঠক শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হলে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত প্রাথমিক পরিকল্পনায় উল্লেখ করা তারিখগুলোকে সম্ভাব্য সময় হিসেবেই দেখা উচিত। বিশেষ করে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ভোট আয়োজন না করার পরামর্শের কারণে আগের সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
সব মিলিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের এই বৈঠক স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে পরবর্তী প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার সময়সূচি, প্রশাসনিক সক্ষমতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোটারদের অংশগ্রহণের সুযোগ বিবেচনায় নিয়ে সময়সূচি চূড়ান্ত করা হলে নির্বাচন পরিচালনায় সমন্বয় বজায় রাখা সহজ হবে। এখন সংশ্লিষ্ট সবার নজর কমিশনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার দিকে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত