প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নারীদের নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও হয়রানিমুক্ত যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে রাজধানীতে চালু করা হয়েছিল বিশেষায়িত ‘পিংক বাস’ সেবা। গণপরিবহনে নারীদের নানা ধরনের অস্বস্তি, হয়রানি ও অনিরাপত্তার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে চালুর প্রায় দুই মাসের মাথায় সেবাটি প্রত্যাশিত যাত্রী পাচ্ছে না। সীমিত রুট, দিনে মাত্র দুটি ট্রিপ, প্রচারের ঘাটতি এবং যাত্রীদের দৈনন্দিন যাতায়াতের চাহিদার সঙ্গে সময়সূচির অসামঞ্জস্যের কারণে বাসগুলোতে পর্যাপ্ত যাত্রী মিলছে না। ফলে পরিচালনাকারী বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে বলে জানা গেছে।
গত ১৮ আগস্ট চালু হওয়া এই সেবার উদ্দেশ্য ছিল রাজধানীর গণপরিবহনে নারীদের জন্য একটি তুলনামূলক নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক বিকল্প তৈরি করা। কিন্তু শুধু নারীদের জন্য বাস চালু করলেই যে একটি পরিবহনসেবা সফল হবে, বাস্তব পরিস্থিতি সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যাত্রীদের প্রয়োজন, চলাচলের সময়, গন্তব্য, রুটের বিস্তৃতি এবং সেবাটি সম্পর্কে মানুষের জানাশোনা—এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় না নিলে ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করা উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না। পিংক বাসের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই চ্যালেঞ্জগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
রাজধানীতে নারীদের গণপরিবহন ব্যবহার করতে গিয়ে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাসে অতিরিক্ত ভিড়, ওঠানামার সময় ধাক্কাধাক্কি, আসন পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়রানি ও অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের কারণে অনেক নারীকে প্রতিদিন অস্বস্তির মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে বাইরে যাওয়া নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা তাই শুধু সুবিধার বিষয় নয়; এটি নিয়মিত কর্মজীবন, শিক্ষা এবং দৈনন্দিন চলাচলের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
এই বাস্তবতা থেকেই নারীদের জন্য বিশেষায়িত বাসসেবার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। পিংক বাস চালুর মাধ্যমে নারীরা যেন নির্দিষ্ট রুটে তুলনামূলক স্বস্তিতে যাতায়াত করতে পারেন, সেটিই ছিল উদ্যোগটির অন্যতম প্রত্যাশা। কিন্তু সেবা চালুর পর দেখা যাচ্ছে, দিনের বড় একটি সময় বাসের আসন ফাঁকা থাকছে। অন্যদিকে সম্ভাব্য যাত্রীদের অভিযোগ, বাসের ট্রিপ এত সীমিত যে প্রয়োজনের সময় সেবাটি ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে একদিকে বাসে যাত্রীসংকট, অন্যদিকে যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত পরিবহন-সুযোগের অভাব—দুটি সমস্যা একই সঙ্গে দেখা দিচ্ছে।
যাত্রীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে পিংক বাসের ট্রিপ রয়েছে দিনে মাত্র দুটি। একটি সকালে এবং অন্যটি বিকেলে। যারা এই নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে নিজেদের কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত কাজের সময় মেলাতে পারেন, তাদের জন্য সেবাটি ব্যবহার করা সম্ভব। কিন্তু কারও কর্মস্থলে পৌঁছানোর সময় ভিন্ন হলে, ক্লাস দেরিতে শুরু হলে, জরুরি কাজে অন্য সময়ে বের হতে হলে কিংবা নির্ধারিত ট্রিপ কোনো কারণে মিস হয়ে গেলে বিকল্প পরিবহন ব্যবহার করা ছাড়া উপায় থাকে না। তখন নিয়মিত বাস, রিকশা অথবা অন্য কোনো যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হয়।
এখানেই পিংক বাসের পরিকল্পনা ও যাত্রীদের বাস্তব চাহিদার মধ্যে ব্যবধানটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গণপরিবহন সাধারণত এমন একটি সেবা, যার ওপর মানুষ নির্দিষ্ট সময় ও গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য নির্ভর করতে চান। একটি বাসসেবা নিরাপদ হলেও সেটি যদি প্রয়োজনের সময় পাওয়া না যায়, তাহলে নিয়মিত যাত্রী তৈরি করা কঠিন। বিশেষ করে ঢাকার মতো ব্যস্ত নগরে মানুষের কর্মঘণ্টা, ক্লাসের সময়, অফিস ছুটির সময় এবং ব্যক্তিগত যাতায়াতের প্রয়োজন এক রকম নয়। তাই সীমিত কয়েকটি ট্রিপ দিয়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর পরিবহনচাহিদা পূরণ করা কতটা সম্ভব, তা নতুন করে বিবেচনার দাবি রাখে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, পিংক বাস চালুর আগে মাঠপর্যায়ে গবেষণা এবং যাত্রীদের চাহিদা যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। কোন এলাকার নারীরা বেশি গণপরিবহন ব্যবহার করেন, কোন রুটে তাদের চলাচল বেশি, দিনের কোন সময়ে যাত্রীর চাপ বাড়ে এবং যাত্রীরা কোথা থেকে কোথায় যেতে চান—এসব তথ্যের ভিত্তিতে রুট ও সময়সূচি নির্ধারণ করা গেলে সেবাটির কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব হতো। কেবল বাস চালু করাই যথেষ্ট নয়; বাসগুলো যাতে নিয়মিত যাত্রী পায় এবং যাত্রীরাও যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা ব্যবহার করতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হয়।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজের বক্তব্যেও পরিকল্পনা ও চাহিদার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, ঢাকার মতো ব্যস্ত নগরে শুধু নারীদের জন্য আলাদা বাসসেবা দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে যেখানে যাত্রীর চাহিদা এবং চলাচলের ধরনকে যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। তাঁর এই পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, একটি বিশেষায়িত পরিবহন উদ্যোগকে টেকসই করতে হলে সামাজিক প্রয়োজনের পাশাপাশি পরিচালনাগত বাস্তবতাও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
তবে যাত্রীসংকটের কারণে সেবাটির মূল উদ্দেশ্যকে অপ্রয়োজনীয় বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের প্রয়োজন বাস্তব। বরং বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, এই প্রয়োজনকে কার্যকর সেবায় রূপ দিতে পরিকল্পনার আরও উন্নয়ন দরকার। একটি উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতা এবং তার নিয়মিত ব্যবহার এক বিষয় নয়। মানুষ কোনো সেবাকে নীতিগতভাবে সমর্থন করতে পারেন, কিন্তু সময়সূচি, রুট কিংবা সহজলভ্যতার সীমাবদ্ধতার কারণে বাস্তবে সেটি ব্যবহার করতে নাও পারেন। তাই পিংক বাসের যাত্রীসংকট বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে শুধু যাত্রীর সংখ্যা নয়, সেবা ব্যবহারের পথে থাকা বাধাগুলোকেও চিহ্নিত করা জরুরি।
প্রচারের ঘাটতিও এই সেবার প্রসারে প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন পরিবহনব্যবস্থা চালু হলে সম্ভাব্য যাত্রীদের কাছে এর রুট, যাত্রার সময়, স্টপেজ, ভাড়া এবং সেবা ব্যবহারের নিয়ম স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। অনেক নারী সেবাটির অস্তিত্ব সম্পর্কে জানেন কি না, জানলেও তাদের প্রয়োজনীয় গন্তব্যে বাসটি যায় কি না, কিংবা নির্ধারিত সময়ে বাস পাওয়া যায় কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা গুরুত্বপূর্ণ। প্রচার বলতে শুধু উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বা সংবাদ প্রকাশ বোঝায় না; যাত্রীদের দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধারাবাহিক তথ্য সরবরাহ এবং সহজে সময়সূচি জানার সুযোগ তৈরি করাও এর অংশ।
বর্তমানে রাজধানীতে ১০টি পিংক বাস চলাচল করছে। বাসের সংখ্যা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। কিন্তু বহরে নতুন বাস যুক্ত করার আগে বিদ্যমান বাসগুলোর ব্যবহার, রুটভিত্তিক যাত্রীসংখ্যা এবং পরিচালন ব্যয়ের বিস্তারিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। যদি বর্তমান বাসগুলোই অধিকাংশ সময় ফাঁকা থাকে, তাহলে শুধু সংখ্যা বাড়ালে লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। অন্যদিকে নির্দিষ্ট রুটে যাত্রীচাহিদা বেশি থাকলেও ট্রিপ কম হলে সেই চাহিদা পূরণ হচ্ছে না—এমন পরিস্থিতিতে রুট ও সময়সূচির পুনর্বিন্যাস কার্যকর হতে পারে। তাই বাসের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কোন এলাকায় কতটি বাস এবং দিনে কতটি ট্রিপ প্রয়োজন, সে বিষয়ে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা জরুরি।
সড়ক পরিবহন প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানিয়েছেন, পিংক বাসসেবা গ্রহণে নারীদের আগ্রহ বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে এই বহরে বৈদ্যুতিক বাস যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার যখন বৈদ্যুতিক বাসের দিকে এগোবে, তখন পিংক বাসের সঙ্গেও সেগুলো যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পরিবহনব্যবস্থার আধুনিকায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বৈদ্যুতিক বাস যুক্ত করা কিংবা বহর সম্প্রসারণের পাশাপাশি সেবার নিয়মিত ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেতে হবে। কারণ পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি বা নতুন যানবাহন যুক্ত হওয়া একা কোনো সেবাকে আর্থিকভাবে টেকসই করে না; যাত্রীদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারাটাই সেখানে মুখ্য।
প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লোকসানের তথ্য বিআরটিসির জন্য আর্থিক চাপের ইঙ্গিত দেয়। রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থার অর্থ পরিচালনার ক্ষেত্রে এই ব্যয়ের কারণগুলো বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। লোকসানের পেছনে জ্বালানি, কর্মী, রক্ষণাবেক্ষণ, বাসের ব্যবহার এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের কী ভূমিকা রয়েছে, তা বিস্তারিত তথ্য ছাড়া নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। তবে যাত্রীসংখ্যা কম থাকলে প্রতিটি ট্রিপের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ অবস্থায় সেবাটি বন্ধ করা কিংবা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে সমস্যার ধরন নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
পিংক বাসের ভবিষ্যৎ সাফল্য নির্ভর করবে নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের প্রয়োজন এবং পরিবহন পরিচালনার বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরির ওপর। নিয়মিত যাত্রীদের সঙ্গে আলোচনা, রুট ও সময়সূচির চাহিদা যাচাই, প্রচার বাড়ানো এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর যাত্রীসংখ্যা ও পরিচালন ব্যয়ের মূল্যায়ন এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। যাত্রীরা কোন সময়ে বাস চান এবং কোন গন্তব্যে যাওয়ার প্রয়োজন বেশি—এসব তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা গেলে সেবাটির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক লক্ষ্য। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য এমন সেবা প্রয়োজন, যা শুধু ঘোষণায় নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব সুবিধা তৈরি করে। পিংক বাসের বর্তমান যাত্রীসংকট তাই কেবল একটি পরিবহন প্রকল্পের আর্থিক লোকসানের খবর নয়; এটি নগর পরিবহন পরিকল্পনায় যাত্রীর চাহিদা, সেবার সহজলভ্যতা এবং বাস্তব ব্যবহারের গুরুত্বও সামনে এনেছে। যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে এই উদ্যোগকে আরও কার্যকর করা সম্ভব কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত