প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ২৬টি ঝুটের গোডাউন পুড়ে গেছে। সোমবার (১২ অক্টোবর) রাত ২টার দিকে ফতুল্লার কাইয়ুমপুর বিলাসনগর এলাকার কাইসাবাড়ি মাঠে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রায় ৩০ হাজার বর্গফুট এলাকাজুড়ে থাকা এসব গোডাউনে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয় আশপাশের এলাকায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন সম্পূর্ণভাবে নির্বাপণ করে।
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাইসাবাড়ি মাঠ এলাকায় আনোয়ার, ইসমাইল, জুয়েল ও মুন্নাসহ কয়েকজনের মালিকানাধীন ঝুটের গোডাউনগুলোতে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করছে ফায়ার সার্ভিস। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এবং অগ্নিকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা আরও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ঝুটের গোডাউনগুলোতে বিভিন্ন ধরনের দাহ্য বর্জ্য ও পোশাকশিল্পের পরিত্যক্ত কাপড় সংরক্ষণ করা থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একটির পর একটি গোডাউনে আগুন ছড়িয়ে পড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের বেশ বেগ পেতে হয়। ঘন ধোঁয়া, বিপুল পরিমাণ দাহ্য সামগ্রী এবং গোডাউনগুলোর ঘনবসতি অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তোলে।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। আগুন নিয়ন্ত্রণে শিবু মার্কেট ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট, নারায়ণগঞ্জ ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট, হাজীগঞ্জ ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট এবং উপসহকারী পরিচালকের কার্যালয়ের একটি ইউনিটসহ মোট সাতটি ইউনিট অংশ নেয়। নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরিফিনের নেতৃত্বে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দীর্ঘ সময় ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন।
ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা রাতভর আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালান। প্রায় দেড় ঘণ্টার প্রচেষ্টার পর রাত সাড়ে ৩টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও তখনো বিভিন্ন স্থানে ধিকিধিকি আগুন জ্বলছিল এবং কিছু জায়গায় আগুন পুনরায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। এ কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সতর্কতার সঙ্গে উদ্ধার ও নির্বাপণ কার্যক্রম চালিয়ে যান। পরে সকাল ৭টার দিকে আগুন সম্পূর্ণভাবে নির্বাপণ করা সম্ভব হয়।
অগ্নিকাণ্ডে প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। কারণ আগুনে ২৬টি গোডাউন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এসব স্থানে বিপুল পরিমাণ ঝুট ও পোশাকশিল্পের পরিত্যক্ত সামগ্রী মজুত ছিল। গোডাউন মালিকদের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে আরও সময় প্রয়োজন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অন্যদিকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনায় প্রায় এক কোটি টাকার মালামাল রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা বিবেচনায় আগুন যদি আরও কিছু সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকত, তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারত বলে ধারণা করা হচ্ছে। আশপাশের অন্যান্য গোডাউন ও স্থাপনায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও ছিল।
রাতের অন্ধকারে হঠাৎ আগুনের শিখা ও ধোঁয়া দেখতে পেয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গোডাউন এলাকায় থাকা দাহ্য ঝুটের কারণে আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় আশপাশের মানুষ নিরাপদ দূরত্বে সরে যান। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিটের পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। দীর্ঘ সময় ধরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের আগুনের সঙ্গে লড়াই করতে দেখে ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
নারায়ণগঞ্জ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। বিশেষ করে ফতুল্লা ও এর আশপাশের এলাকায় তৈরি পোশাকশিল্প, ডাইং, নিটিং এবং বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব শিল্পকারখানা থেকে উৎপন্ন পোশাকের ঝুট ও অন্যান্য বর্জ্য সংগ্রহ করে বিভিন্ন গোডাউনে সংরক্ষণ করা হয়। পরে এসব ঝুট বিভিন্ন কাজে ব্যবহার বা পুনর্ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হয়। ফলে এ ধরনের গোডাউন স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সেখানে দাহ্য পদার্থ মজুত থাকার কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি।
ফতুল্লার কাইসাবাড়ি মাঠের এই অগ্নিকাণ্ড সেই ঝুঁকির বিষয়টিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে একই এলাকায় পাশাপাশি একাধিক গোডাউন থাকলে একটি স্থানে আগুন লাগার পর তা দ্রুত অন্য স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। অগ্নিনিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকায় থাকা ঝুটের গোডাউনগুলোতে বৈদ্যুতিক সংযোগ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি বের হওয়ার পথ এবং দাহ্য সামগ্রী সংরক্ষণের নিয়ম যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, সেটি নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। শিল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নতুন নয়। পুরোনো বা ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক তার, অতিরিক্ত লোড, অপরিকল্পিত সংযোগ কিংবা বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব থেকে মুহূর্তের মধ্যে বড় ধরনের আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে ঝুটের মতো সহজে দাহ্য সামগ্রী মজুত থাকলে সামান্য একটি স্ফুলিঙ্গও ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
এ ধরনের ঘটনায় শুধু সম্পদের ক্ষতি নয়, মানুষের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। রাতের বেলায় অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ঘুমন্ত মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আগুন যদি বসতিপূর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ত, তাহলে প্রাণহানির আশঙ্কাও তৈরি হতে পারত। সৌভাগ্যক্রমে এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বড় পরিসরে সম্পদের ক্ষতি এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ওপর এর আর্থিক প্রভাব নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণের পর ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করা হয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের পাশাপাশি আগুনের সূত্রপাতের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে শর্টসার্কিটের কথা বলা হলেও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য এ অগ্নিকাণ্ড বড় ধরনের আর্থিক ধাক্কা। ঝুটের গোডাউনগুলোর সঙ্গে শুধু মালিক নয়, সংগ্রহকারী, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রীর সঙ্গে যুক্ত আরও অনেক মানুষের জীবিকা জড়িত। একটি গোডাউন পুড়ে গেলে তার প্রভাব শুধু একজন ব্যবসায়ীর ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত পুরো একটি অর্থনৈতিক চক্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মূল্যায়নে পুড়ে যাওয়া মালামালের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
নারায়ণগঞ্জে ঝুটের গোডাউনে এই অগ্নিকাণ্ড আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, শিল্পাঞ্চলে অগ্নিনিরাপত্তাকে কোনোভাবেই অবহেলা করার সুযোগ নেই। নিয়মিত বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রাখা, জরুরি প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ খোলা রাখা এবং দাহ্য সামগ্রী নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কাইসাবাড়ি মাঠে আগুন এখন পুরোপুরি নিভে গেলেও পুড়ে যাওয়া গোডাউনগুলোর ধ্বংসাবশেষ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতি থেকে গেছে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও এই ঘটনার শিক্ষা দীর্ঘমেয়াদি। শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকার প্রতিটি স্থাপনায় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং আগুনের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই ভবিষ্যতে এমন ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত