প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সে দান হিসেবে জমা হওয়া সোনা, রূপা ও বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওজন নির্ধারণ ও গণনার কাজ শুরু হয়েছে। দীর্ঘ ছয় বছর পর এসব মূল্যবান সামগ্রীর হিসাব করতে সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ৯টা থেকে কার্যক্রম শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ট্রেজারিতে নিরাপদে সংরক্ষিত নয়টি মাঝারি আকারের কনটেইনার ও ছয়টি সিলগালাকৃত খাম খুলে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ধর্মপ্রাণ মানুষের দান থেকে জমা হওয়া এসব সম্পদের পরিমাণ, মূল্য এবং পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
পাগলা মসজিদ শুধু কিশোরগঞ্জের একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, এটি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের বিশ্বাস, আবেগ ও দানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি পরিচিত স্থান। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসেন। অনেক দর্শনার্থী নগদ অর্থের পাশাপাশি সোনা, রূপার গহনা এবং বিভিন্ন দেশের মুদ্রাও দান করেন। কারও দান সামর্থ্যের তুলনায় বড়, কারও দান সামান্য; তবে সব দানের পেছনেই থাকে ধর্মীয় অনুভূতি, ব্যক্তিগত আশা কিংবা সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা। সময়ের সঙ্গে এসব দান জমা হয়ে মসজিদের তহবিল ও সম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
সোমবার শুরু হওয়া গণনা ও ওজন নির্ধারণ কার্যক্রমে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইশতিয়াক ইমন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদ এবং কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল হাসান মারুফ। জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও এ কাজে অংশ নেন। মূল্যবান সামগ্রী গণনা, ওজন নির্ধারণ ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করছেন তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ১০ জন পুলিশ সদস্য এবং ছয়জন এসআরবি সদস্য। পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছয়জন কর্মচারী, মসজিদের কর্মচারী, জুয়েলারি সমিতির ১০ জন স্বর্ণকার এবং রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা গণনা ও সংশ্লিষ্ট কাজে সহযোগিতা করছেন। সোনা ও রূপার মতো মূল্যবান সামগ্রী সঠিকভাবে শনাক্ত করা, ধাতুর বিশুদ্ধতা অনুযায়ী পৃথক করা এবং নির্ভুল ওজন নির্ধারণের জন্য এ ধরনের সমন্বিত কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পাগলা মসজিদে দান করা সোনা, রূপা ও বৈদেশিক মুদ্রা দানবাক্স খোলার পরপরই আলাদা করে সিলগালা করা হয়। এরপর সেগুলো জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ট্রেজারিতে সংরক্ষণ করা হয়। এবার দীর্ঘ সময় পর সিলগালা করা কনটেইনার ও খাম খুলে এসব সামগ্রীর বিস্তারিত হিসাব করা হচ্ছে। সোনা ও রূপা ক্যারেট অনুযায়ী পৃথক করে ওজন নির্ধারণ করা হবে। অর্থাৎ, শুধু মোট ওজন হিসাব করাই নয়, ধাতুর বিশুদ্ধতার ধরন অনুযায়ী সেগুলো শ্রেণিবদ্ধ করাও এ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ওজন ও শ্রেণিবিন্যাসের কাজ শেষ হলে সোনা ও রূপার বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হবে। এরপর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে নিলামের মাধ্যমে এসব মূল্যবান সামগ্রী বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে। নিলাম থেকে প্রাপ্ত অর্থ মসজিদের আর্থিক তহবিলের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে, বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা দেশভিত্তিক আলাদা করা হবে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ বিনিময় হার অনুযায়ী সেগুলোর মূল্য নির্ধারণ করে নগদায়ন করা হবে। ফলে সোনা, রূপা ও বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব সম্পন্ন হলে দানের মাধ্যমে পাওয়া এসব সম্পদের আর্থিক মূল্য সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জানান, সর্বশেষ ২০২০ সালের ১১ মার্চ পাগলা মসজিদের দানবাক্সে পাওয়া সোনা, রূপা ও বৈদেশিক মুদ্রা পৃথক করে গণনা করা হয়েছিল। সে সময় ৪১৫ ভরি এক আনা সোনা এবং ১৮৪ ভরি রূপা নিলামে বিক্রি করে মোট ১ কোটি ১৫ লাখ ৪ হাজার ৯০০ টাকা পাওয়া যায়। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা নগদায়ন করে পাওয়া গিয়েছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৫১ টাকা। আগের এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, নগদ অর্থের বাইরেও মসজিদে দান করা মূল্যবান সামগ্রী উল্লেখযোগ্য আর্থিক সম্পদে রূপ নিতে পারে।
জেলা প্রশাসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১১ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৮ বার পাগলা মসজিদের দানবাক্স খোলা হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৭ জুন দানবাক্স খোলা হয়। তবে দানবাক্স খোলার সময়ের সঙ্গে সোনা, রূপা ও বৈদেশিক মুদ্রার বিস্তারিত ওজন ও গণনার সময় এক হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। মূল্যবান সামগ্রী আলাদা করে নিরাপদে সংরক্ষণ, পরে সেগুলো শনাক্ত ও যাচাই এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কারণে হিসাবের কাজ পৃথক সময়ে পরিচালিত হতে পারে। এবার ছয় বছর পর এই মূল্যবান সামগ্রীর হিসাব শুরু হওয়ায় আগের গণনার সঙ্গে নতুন হিসাব তুলনা করার সুযোগও তৈরি হবে।
পাগলা মসজিদের আর্থিক তহবিলের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে মসজিদের তহবিলে জমা রয়েছে ১৩১ কোটি ৮৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮১০ টাকা। এর পাশাপাশি মসজিদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে এ পর্যন্ত ৩৯ লাখ ৩২ হাজার ৯০৬ টাকা অনুদান পাওয়া গেছে। সরাসরি দান এবং অনলাইন অনুদানের এই হিসাব প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থা ও অংশগ্রহণের একটি চিত্র তুলে ধরে। তবে তহবিলের পরিমাণের পাশাপাশি এসব অর্থ কীভাবে সংরক্ষণ, ব্যয় ও পরিচালনা করা হচ্ছে, তা সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে দাতাদের আস্থা বজায় থাকে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ বাড়ে।
মসজিদের উন্নয়ন কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। ১ কোটি ১০ লাখ ৮৮ হাজার ৪৬৪ টাকা ব্যয়ে মসজিদ প্রাঙ্গণে তিনটি নামাজের শেড, অজুখানা এবং নারীদের জন্য ওয়াশব্লক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর এ কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এসব অবকাঠামো নির্মিত হলে মুসল্লিদের নামাজ আদায়, অজু করা এবং নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। বিশেষ করে ধর্মীয় উৎসব, ছুটির দিন কিংবা বেশি দর্শনার্থীর সমাগমের সময়ে পর্যাপ্ত জায়গা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসম্মত সুবিধা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া মসজিদের বাইরে মুসল্লিদের ব্যবহারের জন্য পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণের নকশা প্রণয়নের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পরিকল্পিত উন্নয়ন বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি মসজিদের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে উন্নয়নকাজের ক্ষেত্রে নির্মাণের মান, অর্থের যথাযথ ব্যবহার, পরিচ্ছন্নতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে নগদ অর্থের পাশাপাশি সোনা, রূপা ও বিদেশি মুদ্রা জমা পড়ার বিষয়টি দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। এসব দানের আর্থিক মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি সঠিক হিসাব সংরক্ষণ এবং নিলাম ও নগদায়নের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। কারণ প্রতিটি দান ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষায় দানের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দীর্ঘ ছয় বছর পর মূল্যবান সামগ্রীগুলোর গণনা শুরু হওয়ায় এবার সেগুলোর মোট পরিমাণ ও বাজারমূল্য সম্পর্কে নতুন তথ্য সামনে আসার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে গণনা ও মূল্যায়নের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সোনা, রূপা এবং বৈদেশিক মুদ্রার মোট পরিমাণ বা সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকাশিত হিসাবই এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য চিত্র তুলে ধরবে। একই সঙ্গে দানের অর্থ ও সম্পদ কীভাবে মসজিদের ধর্মীয়, সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজে লাগানো হচ্ছে, সে বিষয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করা হলে দাতা ও সাধারণ মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় হবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত