পাকিস্তান সরকার–পিটিআই সমঝোতায় কতটা সক্ষম ফজলুর রহমান?

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩ বার
পাকিস্তান সরকার–পিটিআই সমঝোতায় কতটা সক্ষম ফজলুর রহমান?

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকার ও প্রধান বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) মধ্যে উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার পথ তৈরি করার প্রশ্নে আবারও আলোচনায় এসেছেন প্রবীণ রাজনীতিক মাওলানা ফজলুর রহমান। রাজনৈতিক সংকট যখন ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে, তখন ক্ষমতাসীন সরকার ও ইমরান খানের দল—উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার সক্ষমতার কারণে তাঁকে সম্ভাব্য সমঝোতার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসাতে তিনি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে রয়েছে ভিন্নমত।

একদিকে পিটিআই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের দাবি জানিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সরকার দলটিকে লংমার্চ প্রত্যাহার করে রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংঘাত এড়িয়ে সমঝোতার পথ খোঁজা উভয় পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে আলোচনার উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

মাওলানা ফজলুর রহমানের রাজনৈতিক অবস্থানও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নেতৃত্বাধীন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-পাকিস্তান (জেইউআই-এফ) জাতীয় পরিষদে ১০টি আসনের অধিকারী। খাইবার পাখতুনখাওয়ার প্রাদেশিক পরিষদে দলটির ১৮টি এবং বেলুচিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে ১২টি আসন রয়েছে। এ ছাড়া সিনেটে দলটির সাতজন সদস্য রয়েছেন। সংখ্যার বিচারে দলটি পাকিস্তানের বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি নয়। তবে সংসদীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অতীতের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাবলিতে ভূমিকা রাখার কারণে ফজলুর রহমান এখনো আলোচনার বাইরে নন।

তবে তাঁর বর্তমান সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে সরকার কিংবা পিটিআইয়ের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করা কতটা সম্ভব, সে প্রশ্ন রয়েছে। খাইবার পাখতুনখাওয়ায় পিটিআই সরকারের বিরোধী অবস্থানে রয়েছে জেইউআই-এফ। বেলুচিস্তানেও দলটি বিরোধী শিবিরে। ফলে দুই প্রদেশের সরকার পরিচালনায় ফজলুর রহমানের দলের সরাসরি প্রভাব সীমিত। জাতীয় পরিষদেও আসনসংখ্যা আগের তুলনায় তাঁর দর-কষাকষির ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে বলে মনে করেন কিছু পর্যবেক্ষক।

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহও ফজলুর রহমানের মধ্যস্থতার সক্ষমতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জেইউআই-এফ প্রধানের সঙ্গে সরকারের বৈঠক হলেও সরকার ও পিটিআইকে আলোচনার টেবিলে বসানোর বিষয়ে তিনি কোনো সুস্পষ্ট আশ্বাস দেননি। এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা নিশ্চিত করার মতো অবস্থানে তিনি আছেন কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

পাকিস্তানের পার্লামেন্টবিষয়ক মন্ত্রী তারিক ফজল চৌধুরীও দাবি করেছেন, ফজলুর রহমানের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে পিটিআই নেতাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। রাজনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রে এমন বিভক্তি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কোনো পক্ষের একটি অংশ যদি মধ্যস্থতাকারীর উদ্যোগে আস্থা না রাখে, তাহলে আলোচনার প্রস্তাব গ্রহণ করা কিংবা সমঝোতার শর্ত নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় পিটিআইয়ের সভাপতি জুনায়েদ আকবর জানিয়েছেন, তাঁর দল ফজলুর রহমানকে মধ্যস্থতার দায়িত্ব দিয়েছে। তবে তিনি একই সঙ্গে বলেছেন, মাওলানা এখনো তাঁদের সরকারের কাছে কোনো প্রস্তাব পৌঁছে দেননি। এই বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, পিটিআইয়ের একাংশ তাঁর ভূমিকার প্রতি আগ্রহী হলেও আলোচনার বাস্তব অগ্রগতি এখনো সীমিত।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ অবশ্য মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ফজলুর রহমানের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিকের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব লেজিসলেটিভ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সির (পিলড্যাট) সভাপতি আহমেদ বিলাল মাহবুবের মতে, দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারলে ফজলুর রহমানই তা করতে সক্ষম হতে পারেন। তাঁর যুক্তি, বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থায় সরকার ও বিরোধী দল—দুই পক্ষেরই মুখরক্ষা করার প্রয়োজন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি গ্রহণযোগ্য আলোচনার উদ্যোগ সংঘাত এড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এখানে মূল বিষয়টি শুধু কে আলোচনার উদ্যোগ নেবেন, তা নয়; বরং দুই পক্ষ কীভাবে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এসে গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথে এগোবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পিটিআইয়ের দাবি, ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দিতে হবে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে সরকার লংমার্চ প্রত্যাহার এবং রাজধানীতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি না করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমঝোতার জায়গা তৈরি করতে হলে উভয় পক্ষকেই কিছুটা নমনীয় হতে হবে।

ফজলুর রহমানের রাজনৈতিক অতীত তাঁকে এ ক্ষেত্রে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২২ সালে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পিটিআই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের (পিডিএম) নেতা ছিলেন তিনি। এর আগে ২০১৯ সালে ইমরান খানের পদত্যাগের দাবিতে বিপুলসংখ্যক সমর্থক নিয়ে ইসলামাবাদে দীর্ঘ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তিনি। সে সময় তাঁর নেতৃত্বে রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল, যা পাকিস্তানের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

সংবিধান সংশোধন ঘিরেও একসময় ফজলুর রহমানের দল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ২৬তম সংবিধান সংশোধনী পাসের সময় সরকারের পক্ষে জেইউআই-এফের সমর্থন আদায় করা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দলটির সদস্যদের ভোটের পাশাপাশি স্বতন্ত্র ও পিটিআই-সমর্থিত কয়েকজন সদস্যের সমর্থনও সংশোধনী পাসের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। সিনেটেও জেইউআই-এফের সদস্যদের সমর্থন নিয়ে সরকারকে হিসাব করতে হয়েছিল। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, আসনসংখ্যা সীমিত হলেও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ফজলুর রহমানের দল গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির অবস্থান তৈরি করতে পারে।

তবে পরবর্তী সময়ে ২৭তম সংবিধান সংশোধনী ঘিরে তাঁর প্রভাবের সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। ২০২৫ সালে সংরক্ষিত আসন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে ক্ষমতাসীন জোটের জাতীয় পরিষদের আসনসংখ্যা বেড়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে জোটের সংসদীয় শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেইউআই-এফের সমর্থনের ওপর সরকারের নির্ভরতা কমে যায়। একই বছরের নভেম্বরে ফজলুর রহমান জানান, তাঁর দল ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর পক্ষে ভোট দেবে না। কিন্তু সে সময় প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, সিনেটে জেইউআই-এফের সমর্থন ছাড়াও সরকারের পক্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। ফলে সংসদীয় সমীকরণে তাঁর দলের আগের মতো অপরিহার্য অবস্থান আর নেই—এমন ধারণা জোরালো হয়।

বর্তমান সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খাইবার পাখতুনখাওয়ার পরিস্থিতি। পিটিআইয়ের নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে বিরোধ আন্দোলনকে আরও জটিল করে তুলেছে। পিটিআই-সংশ্লিষ্ট নেতারা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, লংমার্চে বাধা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংলাপের উদ্যোগ ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জেইউআই-এফের মুখপাত্র আসলাম ঘুরি স্পষ্ট করেছেন, ফজলুর রহমান নিজেকে সরাসরি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখছেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মাওলানার উদ্দেশ্য হলো সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনা শুরুর পথ তৈরি করা। প্রকৃত মধ্যস্থতাকারীর মতো দুই পক্ষের দাবি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর হাতে নেই। এ কারণে দলটি পার্লামেন্টে একটি সর্বদলীয় সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

এই প্রস্তাব কার্যকর হলে রাজনৈতিক বিরোধকে রাজপথ থেকে সংসদীয় আলোচনার পরিসরে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সম্মেলন আয়োজনই যথেষ্ট নয়; আলোচনায় কারা অংশ নেবেন, কোন বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাবে এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা কীভাবে দেওয়া হবে—এসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন। বিশেষ করে ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের দাবি এবং লংমার্চ প্রত্যাহারের প্রশ্নে সমাধান খুঁজে পাওয়া না গেলে আলোচনার উদ্যোগ প্রতীকী পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ফজলুর রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে জেইউআই-এফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। একইভাবে পিটিআইয়ের লংমার্চের সময়সূচি পরিবর্তনে ফজলুর রহমানের ভূমিকা ছিল বলে এক নেতা দাবি করলেও দলের আরেক নেতা তা অস্বীকার করেছেন। এসব পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তাঁর ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা থাকলেও বাস্তব অগ্রগতির চিত্র এখনো অস্পষ্ট।

সব মিলিয়ে, মাওলানা ফজলুর রহমানের হাতে সরকার ও পিটিআইকে সমঝোতায় বাধ্য করার মতো পর্যাপ্ত সংসদীয় শক্তি নেই—এমন যুক্তি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, অতীতের জোট রাজনীতিতে ভূমিকা এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তাঁকে সম্ভাব্য সংলাপ-উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত করেছে। তিনি দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে সংঘাতের বদলে সংলাপের পথ খোলা রাখা জরুরি। ফজলুর রহমান সেই পথ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারেন, তবে সমঝোতা সফল করতে হলে সরকার ও পিটিআই—দুই পক্ষেরই আন্তরিকতা প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতার পাশাপাশি দুই পক্ষের আপসের মানসিকতাই নির্ধারণ করবে, এই উদ্যোগ বাস্তব সমাধানের দিকে এগোবে, নাকি আরেকটি ব্যর্থ রাজনৈতিক প্রচেষ্টায় পরিণত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com