প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মাদকবিরোধী অভিযান, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামকে উদ্দেশ করে কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন সদ্য পদত্যাগ করা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন। নিজের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি বলেছেন, তার বিরুদ্ধে আইনের কোনো ফাঁকফোকর খুঁজে মামলা করা হলে তিনি নিজেই আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যেতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে মাদক নির্মূলে প্রচলিত রাজনৈতিক পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বড় মাদক কারবারি ও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ভিন্ন কৌশলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
সোমবার দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে ইশরাক হোসেন এসব মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মাদকের বিস্তার রোধে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা, আইন প্রয়োগের বাস্তবতা এবং অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব। নাহিদ ইসলামের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইশরাকের এই অবস্থান সামনে আসে। এতে মাদক সমস্যার সমাধান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ইশরাকের অভিযোগ, তার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম মাদক পরিস্থিতি ও এর প্রতিকার নিয়ে গুরুত্ব না দিয়ে বরং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়েছেন। ইশরাকের মতে, মাদকের মতো একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যার বিষয়ে আলোচনা না করে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে অপরাধ অনুসন্ধানের প্রসঙ্গ তোলা হলে মূল সমস্যাটি আড়ালে থেকে যায়। তিনি মনে করেন, মাদকবিরোধী উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা এবং অপরাধের বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া রাজনৈতিক নেতৃত্বের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
নিজের পোস্টে নাহিদ ইসলামের প্রতি হতাশা প্রকাশ করে ইশরাক বলেন, তিনি নাহিদকে অন্তত নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের একজন ধারক হিসেবে বিবেচনা করতেন। কিন্তু তার বক্তব্যে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখতে পাননি। ইশরাকের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদকের মহামারি ও তার প্রতিকার নিয়ে আলোচনা না করে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ খুঁজে বের করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অবস্থানকে তিনি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রত্যাশার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, আগে মাদক সমস্যার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হলে এরপর তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গ আসতে পারত। কিন্তু আলোচনার শুরুতেই ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে অপরাধ অনুসন্ধানের ওপর জোর দেওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশেও হতাশা প্রকাশ করেন ইশরাক। তার বক্তব্য, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রত্যাশা পূরণে যারা এগিয়ে এসেছেন, তাদের কাছ থেকে কার্যকর পরিবর্তন না এলে সেই প্রত্যাশা প্রশ্নের মুখে পড়বে।
ইশরাকের বক্তব্যে মাদক সমস্যার সামাজিক প্রভাবের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। তিনি দাবি করেন, মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে একজন তরুণ তাকে ফোন করেছিলেন। ওই তরুণ পরবর্তী কোনো উদ্যোগে তাকে সঙ্গে নেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেন বলে ইশরাক উল্লেখ করেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, মাদক তরুণদের জীবন ও ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে। তবে ওই তরুণের পরিচয় বা ফোনালাপের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি তিনি।
মাদকাসক্তি এবং মাদক ব্যবসার বিস্তার বাংলাদেশের পরিবার ও সমাজের জন্য দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। মাদকের কারণে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি পারিবারিক অস্থিরতা, আর্থিক সংকট, শিক্ষাজীবনে ব্যাঘাত এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে মাদকের বিস্তার নিয়ে অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের উদ্বেগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মাদকবিরোধী কার্যক্রমের কার্যকারিতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহি নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইশরাক তার বক্তব্যে প্রচলিত রাজনৈতিক পদ্ধতিতে মাদক নির্মূলের উদ্যোগ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার মতে, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত নয়, যেখানে অপরাধ দমনের উদ্যোগ নেওয়া ব্যক্তিকেই শেষ পর্যন্ত ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কায় পড়তে হয়। তিনি নিজের বিরুদ্ধে মামলা করার চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, নাহিদ ইসলাম চাইলে তার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। তিনি নিজেই আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যেতে প্রস্তুত বলেও মন্তব্য করেন।
তবে ইশরাকের এই বক্তব্যের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। একইভাবে তার বক্তব্যে উল্লিখিত অভিযোগ ও রাজনৈতিক মূল্যায়নও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব আইনগত প্রক্রিয়ার। অভিযোগ, তদন্ত, বিচার এবং আদালতের সিদ্ধান্ত—প্রতিটি পর্যায়ের নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি এই প্রক্রিয়াগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখাও জরুরি।
ইশরাকের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বড় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলার ঘোষণা। নিজের পোস্টের শেষাংশে তিনি বড় মাদক ব্যবসায়ী ও বিক্রেতাদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দেন এবং প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে অন্য কৌশলে প্রতিকার করার কথা বলেন। তার ব্যবহৃত ভাষা ছিল আক্রমণাত্মক ও হুঁশিয়ারিমূলক। তবে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, কখন তা নেওয়া হবে কিংবা সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের আইনগত কাঠামো কী হবে—এসব বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
এই বক্তব্যের ফলে মাদকবিরোধী অভিযানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। মাদক ব্যবসা দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি একদিকে যেমন জনসমর্থন পেতে পারে, অন্যদিকে অপরাধ দমনের নামে কোনো পদক্ষেপ যেন আইন ও বিচারব্যবস্থার বাইরে না যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধ দমনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, আইনি সুরক্ষা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মৌলিক দায়িত্বের অংশ।
মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে কার্যকর করতে শুধু অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট কি না, তা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। মাদক সরবরাহের উৎস শনাক্ত করা, বড় কারবারিদের বিরুদ্ধে তদন্ত, অবৈধ অর্থের প্রবাহ অনুসন্ধান, সীমান্ত ও পরিবহনপথে নজরদারি, সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা এবং আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা—এসব ক্ষেত্র সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবে এককভাবে চিহ্নিত না করে তাদের চিকিৎসা, পরিবারকে সহায়তা এবং সমাজে পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
ইশরাক ও নাহিদ ইসলামের বক্তব্য ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব পদক্ষেপের ব্যবধান। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রত্যাশা নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেখানে নাগরিকদের কাছে মাদক নিয়ন্ত্রণের মতো দৃশ্যমান সামাজিক সমস্যার কার্যকর সমাধান গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক নেতারা কী বলছেন, তার পাশাপাশি তারা কী ধরনের নীতিগত উদ্যোগ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বাস্তবসম্মত কর্মসূচি সামনে আনছেন, সেটিও জনসাধারণের মূল্যায়নের বিষয়।
এদিকে ইশরাকের বক্তব্যের বিষয়ে নাহিদ ইসলামের পূর্ণাঙ্গ প্রতিক্রিয়া বা এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিস্তারিত অবস্থান এখানে পাওয়া যায়নি। ফলে দুই নেতার বক্তব্যের বাইরে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য দ্রুত আলোচনার জন্ম দিলেও তার সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য এবং বাস্তব পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
সব মিলিয়ে ইশরাক হোসেনের মন্তব্য শুধু দুই রাজনৈতিক নেতার মধ্যে কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে মাদক নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত হয়েছে। মাদকের বিস্তার রোধে রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে কার্যকর উদ্যোগে রূপান্তর করা, অপরাধের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং আইনের বাইরে কোনো প্রতিক্রিয়াকে উৎসাহিত না করা—এই তিনটি বিষয়ই জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। ইশরাকের ঘোষিত ভিন্ন কৌশল বাস্তবে কী রূপ নেবে, সে বিষয়ে স্পষ্টতা না আসা পর্যন্ত তার বক্তব্যকে রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত মাদকবিরোধী লড়াই কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বক্তব্যের পাশাপাশি আইনসম্মত, জবাবদিহিমূলক ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপের ওপর।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত