রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলেমদের বৈঠক, আলোচনায় ঐক্য ও বিনিয়োগ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলেমদের বৈঠক, আলোচনায় ঐক্য ও বিনিয়োগ

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশিষ্ট আলেম ও ইসলামী ব্যক্তিত্বদের একটি প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে অনুষ্ঠিত এ সাক্ষাতে দেশের ভবিষ্যৎ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, অতীতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আলেম-ওলামাদের ওপর নির্যাতনের স্মৃতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মতো বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতে অবস্থিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ কওমি মাদরাসা পরিদর্শনের আমন্ত্রণও জানানো হয় রাষ্ট্রপতিকে। সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতি দেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মুফতি বশিরুল্লাহ। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব মুফতি হারুন ইজহার ও মাওলানা মীর ইদরিস নদভি। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা রফিকুল ইসলাম, জাতীয় ইমাম খতিব কাউন্সিলের কো-অর্ডিনেটর মাওলানা ফয়সাল এবং খতমে নবুওয়াত বাংলাদেশের প্রচার সম্পাদক মাওলানা আফসার মাহমুদ প্রতিনিধিদলে ছিলেন। সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব ও প্রেস সচিবও উপস্থিত ছিলেন।

সৌজন্য সাক্ষাতের আলোচনায় দেশের অতীত রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আলেম-ওলামাদের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ বিশেষ গুরুত্ব পায়। রাষ্ট্রপতি অতীতের শাসনামলে বিশিষ্ট আলেমদের ওপর নির্যাতন এবং কারাগারে তাঁদের দুর্বিষহ বন্দিজীবনের স্মৃতির কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশ পুনর্গঠনের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে সব পক্ষের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা প্রয়োজন। রাষ্ট্র পরিচালনা ও জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিভেদ কমিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বৈরাচারের পতনের পর মহান আল্লাহ দেশ গঠনের যে সুযোগ দিয়েছেন, তা সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজে লাগাতে হবে। তাঁর বক্তব্যে ভবিষ্যতে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন যেন ফিরে না আসে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে ধর্মের নামে কেউ যেন বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে না পারে, সে ব্যাপারেও সবাইকে সচেতন থাকার কথা বলেন তিনি। এ বক্তব্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সংহতি এবং ধর্মীয় বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণের গুরুত্ব সামনে আসে।

অতীতের অভিজ্ঞতা স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক থাকার যে বার্তা রাষ্ট্রপতি দিয়েছেন, তা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি ধরে রাখতে রাজনৈতিক সহনশীলতা, আইনের শাসন এবং নাগরিকদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাসের মতো সংবেদনশীল বিষয়েও দায়িত্বশীল আচরণ এবং বিভ্রান্তিকর প্রচার থেকে বিরত থাকা সামাজিক শান্তি বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে এসব নীতি বাস্তবে কার্যকর করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক পক্ষগুলোর ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

সাক্ষাতে রাষ্ট্রপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ইসলামী পণ্ডিত ও আলেম-ওলামাদের সম্পর্কের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁরা আলেমদের সম্মান করতেন। রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী, ইসলামের প্রতি মমত্ববোধ থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম’ সংযোজন করেন। এ ছাড়া আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি নিজের বর্তমান অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, তিনি এখন সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক মানুষ। তবে ইসলামী মূল্যবোধ ও শরিয়ায় আঘাত আসে, এমন কোনো কাজ যাতে কেউ না করে, সে বিষয়ে তিনি নজর রাখবেন বলেও জানান। তাঁর বক্তব্যে রাষ্ট্রপতির অরাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুভূতি, সাংবিধানিক কাঠামো এবং নাগরিকদের অধিকার—এসব বিষয় কীভাবে সমন্বিতভাবে বিবেচিত হয়, তা বাংলাদেশের জনপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ।

সৌজন্য সাক্ষাতের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা মধ্যপ্রাচ্যের ধনী ও উন্নত দেশগুলো থেকে বিনিয়োগ এবং অনুদান সহায়তা আনার ক্ষেত্রে তাঁদের আরবি ভাষায় দক্ষতা, যোগাযোগের সক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত সংযোগ কাজে লাগানোর সুযোগের কথা তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল, এসব যোগাযোগকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সহযোগিতা বৃদ্ধির কাজে ব্যবহার করা।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং উন্নয়ন সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, প্রবাসী আয় ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের সম্পর্ক রয়েছে। এসব সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি, ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্প চিহ্নিত করা প্রয়োজন। প্রতিনিধিদলের প্রস্তাব সেই বৃহত্তর সম্ভাবনার দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে কোন দেশ থেকে কী পরিমাণ বিনিয়োগ বা অনুদান আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সাক্ষাতের বিবরণে নির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক, প্রকল্প বা সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি।

প্রতিনিধিদলের এ প্রস্তাবের জবাবে রাষ্ট্রপতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেন। এ ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাসও দেন তিনি। রাষ্ট্রপতির এ পরামর্শের মধ্য দিয়ে প্রস্তাবিত উদ্যোগকে কার্যকর করতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের গুরুত্ব উঠে আসে। ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা ভাষাগত দক্ষতা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক হলেও বিনিয়োগ আকর্ষণ ও অনুদান সংগ্রহের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, প্রকল্পের স্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ অপরিহার্য।

বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রকল্পের অর্থনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, আইনি কাঠামো, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে অনুদান সহায়তা সংগ্রহের ক্ষেত্রে অর্থের ব্যবহার, প্রকল্পের উদ্দেশ্য এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে সম্ভাব্য যোগাযোগকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে রাষ্ট্রপতির আশ্বাসের পর এ বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে সম্পর্কে পরবর্তী কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য প্রকাশিত বিবরণে নেই।

সাক্ষাতের শেষ পর্যায়ে প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী দারুল উলুম মাদরাসা এবং ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসা পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানায়। বাংলাদেশের কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর ধর্মীয় শিক্ষা ও আলেম তৈরির ক্ষেত্রে পরিচিতি রয়েছে। প্রতিনিধিদলের আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির যোগাযোগের একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র সামনে আসে।

রাষ্ট্রপতি সুবিধাজনক সময়ে মাদরাসা দুটি সফর করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহও জানান তিনি। তবে সফরের নির্দিষ্ট তারিখ বা সময়সূচি নির্ধারণের তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য সফর ও সাক্ষাৎকে এখনই চূড়ান্ত কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে পরবর্তী যোগাযোগের ভিত্তিতেই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যেতে পারে।

আলেম প্রতিনিধিদলের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির এ সাক্ষাতে ধর্মীয় মূল্যবোধ, অতীত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, জাতীয় ঐক্য এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো একাধিক বিষয় উঠে এসেছে। একদিকে রাষ্ট্রপতি অতীতের নির্যাতনের স্মৃতি স্মরণ করে ভবিষ্যতে স্বৈরাচারী শাসন ফিরে না আসার বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন; অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর প্রস্তাবে সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও হেফাজতে ইসলামের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

সব মিলিয়ে, এ সৌজন্য সাক্ষাৎ শুধু ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির মতবিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি; আলোচনায় জাতীয় ঐক্য, ধর্মীয় সম্প্রীতি, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ও স্থান পেয়েছে। এসব আলোচনার বাস্তব ফলাফল নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী উদ্যোগ, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতির ওপর। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিনিয়োগ ও অনুদান আনার প্রস্তাব বাস্তব রূপ পেলে তা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অবদান রাখার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো চুক্তি বা বিনিয়োগের ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com