ফ্রান্সে গুলির ঘটনাকে বর্ণবাদী সন্ত্রাস বললেন মাখোঁ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩ বার
ফ্রান্সে গুলির ঘটনাকে বর্ণবাদী সন্ত্রাস বললেন মাখোঁ

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অদূরে পরপর দুটি শহরে গুলির ঘটনাকে ‘বর্ণবাদী সন্ত্রাসী’ হামলা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। শুক্রবারের এ ঘটনায় একজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর, যাঁদের একজন ১২ বছর বয়সী শিশু। হামলার পেছনে জাতিগত পরিচয় ও ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করার উদ্দেশ্য ছিল বলে মন্তব্য করেছেন মাখোঁ। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এখনো নিশ্চিত হয়নি। ফ্রান্সের জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কৌঁসুলির দপ্তর ঘটনাটিকে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে তদন্ত শুরু করেছে।

শুক্রবার সকালে প্যারিসের দক্ষিণ-পশ্চিমে ট্রাপেস শহরে একটি গাড়ি থেকে গুলি চালাতে শুরু করেন এক ব্যক্তি। পরে তিনি পাশের লা ভেরিয়ের শহরের দিকে যান এবং সেখানেও গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে চলা এই হামলায় বিভিন্ন স্থানে লোকজনকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। হামলার পর পুলিশ সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত ও নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদার করে।

ট্রাপেস শহর পরিদর্শনে গিয়ে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ বলেন, হামলাকারী মানুষের গায়ের রং ও ধর্মের কারণে তাঁদের নিশানা করেছেন। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের বর্ণবাদী সহিংসতার সামনে কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। সমাজে কিছু মতাদর্শের শিকড় গেড়ে বসার বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, মানুষের পরিচয়কে কেন্দ্র করে সহিংসতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তবে হামলার উদ্দেশ্য ও সন্দেহভাজন ব্যক্তির মানসিক বা আদর্শিক প্রেরণা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

ফরাসি জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কৌঁসুলির দপ্তর বা পিএনএটি জানিয়েছে, ঘটনাটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। এ কারণে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তদন্তকারীরা হামলার পরিকল্পনা, ব্যবহৃত অস্ত্র, সন্দেহভাজনের যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা তথ্য থেকে হামলার সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে প্রেসিডেন্টের বর্ণবাদী হামলার মূল্যায়ন এবং তদন্তকারীদের আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান—দুটি বিষয়ই আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম কেভিন টি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বয়স ৩৯ বছর। পিএনএটির তথ্য অনুযায়ী, অতীতে চারটি অপরাধে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। তবে সেসব অপরাধের দণ্ড বা রেকর্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যাওয়ায় তাঁর পূর্ববর্তী অপরাধের তথ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পুলিশ তাঁকে আগে থেকেই চিনত, কিন্তু তিনি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরদারিতে ছিলেন না। পিএনএটি আরও জানিয়েছে, সন্দেহভাজন ব্যক্তি দেশের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের তালিকায় ছিলেন না। এ ঘটনায় তাঁর পরিবারের একজন সদস্যকেও আটক করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে ওই সদস্যের পরিচয়, আটকের কারণ কিংবা ঘটনার সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

ট্রাপেসের মেয়র আলি রাবেহের বর্ণনা অনুযায়ী, হামলাকারী গাড়ি নিয়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে লোকজনকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। একটি পেট্রলপাম্প, চিকিৎসাকেন্দ্র এবং শিশুদের খেলার মাঠের কাছাকাছি এলাকায় গুলির ঘটনা ঘটে। এরপর তিনি পাশের লা ভেরিয়ের শহরের দিকে যান, সেখান থেকে তাঁকে আটক করা হয়। মেয়র হামলাকারীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, তাঁর ধারণা ছিল যত বেশি সম্ভব মানুষকে হতাহত করা। তবে হামলার পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্তের তথ্যের ওপর নির্ভর করবে।

গুলিতে আহতদের মধ্যে ১২ বছর বয়সী এক শিশুর অবস্থা বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। শিশুটির মা ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএলকে জানিয়েছেন, তাঁর মেয়ের শরীরে আটটি গুলির ক্ষত রয়েছে এবং অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। নিজের সন্তানের ওপর এমন হামলার কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে কেউ একটি শিশুর সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারে। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে একজন অভিভাবকের অসহায়তা ও আতঙ্ক, যিনি মেয়েকে নিরাপদে বড় করে তোলার প্রত্যাশা করেন, কিন্তু হঠাৎ করেই তাঁকে ভয়াবহ সহিংসতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

শিশুটির মা আরও বলেন, তাঁর মেয়ে মাথায় স্কার্ফ পরেছিল। এ কারণে মেয়েটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়ে থাকতে পারে কি না, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর মেয়ে ফ্রান্সে জন্মেছে এবং দেশটিতে বসবাস করে নিজের জীবন গড়ে তোলার অধিকার তার রয়েছে। মায়ের এই বক্তব্য হামলার সম্ভাব্য বর্ণবাদী বা ধর্মীয় উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তবে শিশুটিকে বিশেষভাবে স্কার্ফ পরার কারণে লক্ষ্য করা হয়েছিল কি না, তা এখনো তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তি একটি আধা স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন, যার মাধ্যমে দ্রুত একাধিক গুলি ছোড়া সম্ভব। ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে প্যারিসিয়াঁর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ত্রটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার। তবে অস্ত্রটির নির্দিষ্ট ধরন, সেটি কীভাবে সন্দেহভাজনের হাতে এসেছে এবং আইন অনুযায়ী সেটি তাঁর কাছে রাখার অনুমতি ছিল কি না, এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তদন্তে অস্ত্রের উৎস ও ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ঘটনার পর ফ্রান্সে বর্ণবাদ, ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশটির বিভিন্ন শহরে নানা জাতিগত ও ধর্মীয় পটভূমির মানুষের বসবাস। এমন পরিস্থিতিতে কোনো হামলার পেছনে পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষ কাজ করেছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী করে সামগ্রিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও উচিত নয়। সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অবস্থান যেমন প্রয়োজন, তেমনি আইনের শাসন ও প্রমাণভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

এ ধরনের হামলার প্রভাব শুধু নিহত ও আহত ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আহতদের পরিবারকে চিকিৎসা ও মানসিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, আর প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ভীতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিশুরা যখন সহিংসতার শিকার হয়, তখন তাদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা এবং মানসিক পুনর্বাসনের বিষয়টি বাড়তি গুরুত্ব পায়। আহতদের চিকিৎসার অগ্রগতি, নিহত ব্যক্তির পরিচয় এবং পরিবারের প্রতি সহায়তার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পরবর্তী তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

প্যারিসের অদূরে ট্রাপেস ও লা ভেরিয়েরের এই গুলির ঘটনায় এখন তদন্তকারীদের সামনে প্রধান কাজ হলো হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য নির্ধারণ, ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস অনুসন্ধান এবং সন্দেহভাজনের সম্ভাব্য সহযোগী বা যোগাযোগের বিষয় যাচাই করা। প্রেসিডেন্ট মাখোঁ ঘটনাটিকে বর্ণবাদী সন্ত্রাসী হামলা বলে বর্ণনা করেছেন, আর জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কৌঁসুলির দপ্তর সম্ভাব্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দিকটি তদন্ত করছে। তদন্তের ফলই শেষ পর্যন্ত হামলার প্রকৃতি ও দায় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে। এর মধ্যে নিহত ব্যক্তির পরিবারের প্রতি সমবেদনা, আহতদের চিকিৎসা এবং স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com