লন্ডনে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ভাইয়ের দেড় কোটি পাউন্ডের ফ্ল্যাট জব্দ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩ বার
লন্ডনে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ভাইয়ের দেড় কোটি পাউন্ডের ফ্ল্যাট জব্দ

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী ওরফে রনির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় দেড় কোটি পাউন্ড মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বিক্রি ও হস্তান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন দেশটির হাইকোর্ট। রিজেন্টস পার্ক এলাকার কাছে অবস্থিত এই সম্পত্তি কীভাবে কেনা হয়েছিল, অর্থের উৎস কী এবং মালিকানা আড়াল করতে কোনো জটিল কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ)। সম্ভাব্য অর্থ পাচার, দুর্নীতি, প্রতারণা ও অপরাধলব্ধ অর্থের সঙ্গে সম্পত্তিটির সম্পর্ক থাকার অভিযোগের ভিত্তিতে আদালতের এই আদেশ এসেছে।

বিষয়টি শুধু একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে আইনি বিরোধ নয়; বরং বিদেশে সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস, প্রকৃত মালিকানা এবং আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বৃহত্তর তদন্তের অংশ। তবে আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারির অর্থ এই নয় যে, সম্পত্তিটি ইতিমধ্যে চূড়ান্তভাবে অবৈধ সম্পদ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে। আনিসুজ্জামান চৌধুরী বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

যুক্তরাজ্যের আদালতে ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ফ্ল্যাটটির প্রকৃত মালিকানা ও কেনার অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংস্থাটির দাবি, সম্পত্তিটি কেনার জন্য ব্যবহৃত অর্থের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি আনিসুজ্জামান চৌধুরী। এ কারণে সম্পত্তিটি অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে কেনা হয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তকারীরা সন্দেহ করছেন। চলতি সপ্তাহে হাইকোর্ট থেকে ফ্ল্যাটটি বিক্রি বা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর না করার নির্দেশ পাওয়ার পর সম্পত্তিটির ওপর আইনি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।

আদালতে এনসিএর একজন তদন্ত কর্মকর্তা লিখিত সাক্ষ্যে বলেন, সম্পত্তিটির প্রকৃত মালিকানা আড়াল করার উদ্দেশ্যে জটিল মালিকানা কাঠামো তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। তদন্তকারীদের অভিযোগ, বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে এর সঙ্গে আনিসুজ্জামান চৌধুরীর সম্পর্ক সহজে শনাক্ত করা না যায়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে আদালত সম্পত্তিটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেন।

বিচারপতি কারেন স্টেইন তাঁর রায়ে বলেন, ফ্ল্যাটটি অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে কেনা হয়ে থাকতে পারে—এমন দাবি করার যথেষ্ট যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে। সেই বিবেচনায় সম্পত্তিটি বিক্রি বা হস্তান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তবে আদেশে এমন সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে সম্পত্তির দখল ফিরে পেতে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন। আদালতে আনিসুজ্জামান চৌধুরীর আইনজীবীরা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেননি। কিন্তু এর মাধ্যমে অভিযোগ স্বীকার করা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

ফ্ল্যাটটির ক্রয় ও মালিকানা পরিবর্তনের ঘটনাপ্রবাহও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্যের ভূমি নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রনি ৪২ লিমিটেড নামের একটি কোম্পানির মাধ্যমে ফ্ল্যাটটি কেনা হয়েছিল। তখন সম্পত্তিটির মূল্য ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ পাউন্ড। পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটির নাম পরিবর্তন করে পিএনএন ইউকে প্রপার্টিজ রাখা হয়। বর্তমানে সম্পত্তিটির মূল্য প্রায় দেড় কোটি পাউন্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তকারীদের নজরে এসেছে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কোম্পানিটির শেয়ার মাত্র এক পাউন্ডের বিনিময়ে তৃতীয় একটি পক্ষের কাছে হস্তান্তরের ঘটনা। এনসিএর অভিযোগ, এই লেনদেনের মাধ্যমে সম্পত্তিটির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ আড়াল করার চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে। সংস্থাটি আদালতে আরও জানায়, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শেষ পর্যন্ত সম্পত্তিটির মালিকানা আনিসুজ্জামান চৌধুরীর স্ত্রী ও দুই মেয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। তবে এই অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের জন্য তদন্ত ও আইনি পর্যালোচনা প্রয়োজন।

এনসিএর আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এক পাউন্ডে শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়টি শুধু মালিকানা পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সঙ্গে ফ্ল্যাটটি বন্ধক রেখে নেওয়া ঋণের পুনঃঅর্থায়নের উদ্যোগেরও সম্পর্ক ছিল। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ডিবিএস ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ নতুনভাবে অর্থায়নের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে ব্যাংকটি এখন ফ্ল্যাটটির দখল নেওয়ার জন্য আইনি প্রক্রিয়া চালাচ্ছে বলে এনসিএ আদালতকে জানিয়েছে।

আনিসুজ্জামান চৌধুরী তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি কোনো বেআইনি কাজ করেননি এবং সম্পত্তির মালিকানা গোপন করার অভিযোগও সত্য নয়। ভবিষ্যতে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য কোনো দেওয়ানি মামলা হলে তিনি জোরালোভাবে তা মোকাবিলা করবেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। ফলে একদিকে তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অস্বীকৃতি—দুই দিকই মামলার পরবর্তী গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এই মামলা যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে চলমান বৃহত্তর তদন্তের সঙ্গে যুক্ত। এর আগে ২০২৫ সালের জুনে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৮ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি জব্দের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কোম্পানিকে সম্পদের উৎস ব্যাখ্যা করার জন্য আদালতের আদেশের আওতায় আনা হয়। যুক্তরাজ্যে এ ধরনের আদেশকে ‘আনএক্সপ্লেইনড ওয়েলথ অর্ডার’ বা ইউডব্লিউও বলা হয়।

এ ধরনের আদেশের উদ্দেশ্য হলো, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোনো ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ ও পরিচিত বৈধ আয়ের মধ্যে অসংগতি নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্ন উঠলে সম্পদের অর্থায়ন সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাওয়া। তবে সম্পদের উৎস ব্যাখ্যা করতে না পারা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেন। তাই তদন্তের আওতায় থাকা কোনো সম্পদ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে অভিযোগ, জব্দ বা নিষেধাজ্ঞার আদেশ এবং চূড়ান্ত বিচারিক রায়ের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।

আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর স্বজনেরা ১৯৯২ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২৯ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পত্তির মালিক হন। এই সম্পদের উৎস ও অর্জনের প্রক্রিয়া নিয়ে যুক্তরাজ্যের তদন্তকারীরা যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা বিদেশে সম্পদ কেনার ক্ষেত্রে অর্থের বৈধ উৎস এবং প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করার গুরুত্ব সামনে এনেছে। তবে এসব সম্পত্তির সবকটিকে অবৈধ বলে ধরে নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার ফল বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে—এমন অর্থ ও সম্পদের সন্ধানে তৎপরতা বাড়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত করা, অর্থের উৎস অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ ধরনের অনুসন্ধানে বিদেশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময়, আর্থিক নথি পর্যালোচনা এবং আদালতের মাধ্যমে সম্পদ সংরক্ষণের পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

লন্ডনের ফ্ল্যাটটির ঘটনায় কয়েকটি প্রশ্ন এখনো তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে: সম্পত্তি কেনার অর্থ কোথা থেকে এসেছিল, কোম্পানির শেয়ার এক পাউন্ডে হস্তান্তরের পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল, মালিকানা কাঠামো তৈরির সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন এবং ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার সঙ্গে সম্পত্তির বর্তমান অবস্থার সম্পর্ক কী। এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে মামলার প্রকৃতি ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা তৈরি হতে পারে।

বিদেশে সম্পদ অর্জন নিজে থেকেই অপরাধের প্রমাণ নয়। তবে কোনো সম্পত্তির অর্থের উৎস নিয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী তদন্ত ও আদালতের পর্যালোচনা হতে পারে। লন্ডনের এই ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে আপাতত বিক্রি ও হস্তান্তর বন্ধ রাখার আদেশ সম্পত্তিটির অবস্থান অপরিবর্তিত রাখবে, যাতে তদন্ত চলাকালে মালিকানা বদলে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। শেষ পর্যন্ত সম্পত্তিটি বাজেয়াপ্ত হবে কি না, অর্থের উৎস সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত আসবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরও কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না—তা নির্ভর করবে তদন্তে পাওয়া প্রমাণ ও আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com