মাদরাসায় যৌন নির্যাতন রোধে আলেমদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২ বার
মাদরাসায় যৌন নির্যাতন রোধে আলেমদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাদরাসায় শিশুদের ওপর বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো গুরুতর যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে ধর্মীয় নেতাদের আরও জোরালো অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তাঁর মতে, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘটিত এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আলেম সমাজের নেতৃত্ব, জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা এবং মাদরাসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকাশ্যে কথা বলা জরুরি। অপরাধের বিরুদ্ধে নীরবতা কিংবা অপরাধীদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো হলে তা শুধু ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করবে না, বরং সামগ্রিকভাবে ধর্মীয় নেতৃত্ব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ নজরুল এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে মাদরাসায় শিশুদের নিরাপত্তা, যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ, ধর্মীয় নেতাদের নৈতিক দায়িত্ব এবং অপরাধের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করেন, সমাজে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের প্রতি মানুষের যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে, তা ধরে রাখতে হলে শিশুদের ওপর নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।

ফেসবুক পোস্টে আসিফ নজরুল বাংলাদেশের আলেম সমাজের অনেক ব্যক্তির প্রতি নিজের শ্রদ্ধার কথা উল্লেখ করেন। হজ পালন, নামাজ আদায় কিংবা ইসলামী আলোচনা শুনতে গিয়ে বিভিন্ন আলেমকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি মাওলানা আহমাদুল্লাহর মতো কয়েকজন আলেমের মানবিক কর্মকাণ্ড তাঁকে মুগ্ধ করেছে বলেও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যের এই অংশে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ইতিবাচক ভূমিকার স্বীকৃতির পাশাপাশি বৃহত্তর আলেম সমাজের কাছে অপরাধ প্রতিরোধে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের প্রত্যাশা প্রকাশ পেয়েছে।

তবে আসিফ নজরুলের অভিযোগ, মাদরাসার শিক্ষকসহ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তির সংখ্যা হয়তো তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু সমস্যাটিকে উপেক্ষা করার মতো নগণ্য নয়। শিশুদের প্রতি এমন নির্যাতনকে তিনি গুরুতর ধর্মীয় ও নৈতিক অপরাধ হিসেবে তুলে ধরে প্রশ্ন তুলেছেন, এসব ঘটনার বিরুদ্ধে আলেম সমাজের বড় একটি অংশকে কেন আরও দৃশ্যমানভাবে প্রতিবাদ করতে দেখা যায় না।

শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন এমন একটি অপরাধ, যার প্রভাব কেবল তাৎক্ষণিক শারীরিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ভুক্তভোগী শিশুর মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ জীবনেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার থেকে দূরে থাকা এবং শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে অনেক শিশু নির্যাতনের শিকার হলেও তা প্রকাশ করতে ভয় পেতে পারে। সামাজিক লজ্জা, অবিশ্বাস, ভয়ভীতি কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কাও অভিযোগ জানানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এ কারণে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতা, স্থানীয় সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। কোনো অভিযোগ সামনে এলে তা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অপরাধের অভিযোগকে প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষার অজুহাতে আড়াল করার চেষ্টা করা হলে ভুক্তভোগী আরও অসহায় হয়ে পড়তে পারেন এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

আসিফ নজরুল তাঁর পোস্টে আলেম সমাজের বক্তব্য ও সামাজিক প্রভাবের বিষয়টিও সামনে এনেছেন। তিনি বলেন, খাবার, পোশাক, বিনোদন ও বাক্‌স্বাধীনতার মতো নানা সামাজিক বিষয়ে ধর্মীয় নেতাদের কেউ কেউ নিয়মিত মতামত দেন। কোনো কোনো ঘটনায় সামাজিক উত্তেজনা ও সংঘবদ্ধ প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কিন্তু নিজেদের গোষ্ঠী বা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে একই ধরনের জোরালো প্রতিবাদ কেন দেখা যায় না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

তাঁর বক্তব্যের মূল সুর হলো, ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা বলার পাশাপাশি সেই মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত হলে তাঁর পরিচয়, পদমর্যাদা কিংবা ধর্মীয় প্রভাব যেন জবাবদিহি এড়ানোর সুযোগ তৈরি না করে। বরং শিশুদের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে ধর্মীয় নেতৃত্বের স্পষ্ট অবস্থান সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াতে পারে। অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সম্প্রদায়ের বিরোধিতা নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশ বজায় রাখারই অংশ।

আসিফ নজরুল তাঁর পোস্টে বাংলাদেশের সমাজে ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্রের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আলেম সমাজ মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কারণে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সম্মান ধরে রেখেছে। কিন্তু শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে যথেষ্ট সোচ্চার না হলে সেই শ্রদ্ধা ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, অপরাধীদের প্রতি কারও কারও সহানুভূতি কিংবা নীরবতা বৃহত্তর ধর্মীয় সমাজকেও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে পারে। তবে কোনো অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অপরিহার্য।

মাদরাসা বাংলাদেশের ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রতিষ্ঠানে বহু শিক্ষার্থী ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সাধারণ জীবনযাপনের বিভিন্ন দক্ষতা শেখে। বহু শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও নৈতিক বিকাশে ভূমিকা রাখেন। ফলে কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে এককভাবে দায়ী করা যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধের অভিযোগ অগ্রাহ্য করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরং নির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা যাচাই, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার।

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাদরাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা যেন ভয় ছাড়াই নির্যাতনের কথা বলতে পারে, সে জন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ, অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং অভিযোগ গোপন রেখে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি শিশুদের সঙ্গে একান্তে আচরণ, আবাসিক তত্ত্বাবধান এবং অভিযোগের পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার। কোনো অভিযোগ উঠলে অভিযুক্তকে আগেভাগে দোষী ঘোষণা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে; একই সঙ্গে তদন্ত চলাকালে সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে শিশুকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে।

ধর্মীয় নেতারা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। খুতবা, ওয়াজ, ধর্মীয় আলোচনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের প্রতি সহিংসতা এবং যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট বার্তা দিলে পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ না করা, অভিযোগকারীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করা এবং অপরাধের বিচার চাওয়াকে সামাজিকভাবে সমর্থন করার বিষয়েও তাঁরা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। অপরাধের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান তখনই কার্যকর হবে, যখন তা বাস্তব পদক্ষেপ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত হবে।

ফেসবুক পোস্টের শেষাংশে আসিফ নজরুল আশা প্রকাশ করেন, আলেম সমাজের নেতৃত্ব শিগগিরই এ বিষয়ে আরও সক্রিয় হবে। মাদরাসায় বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুশাসনের আলোকে কঠোর বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাবেন তাঁরা—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।

শিশুদের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সমাজের কোনো অংশের নীরবতা যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটিই এই আহ্বানের গুরুত্বপূর্ণ দিক। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, অপরাধীর জবাবদিহি এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদার করা গেলে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব শিক্ষাঙ্গনে নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। শিশুদের প্রতি নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা বা পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি সমাজের সম্মিলিত নৈতিক দায়িত্ব। ধর্মীয় নেতৃত্ব সেই দায়িত্ব পালনে সক্রিয় হলে অপরাধ প্রতিরোধ এবং মানুষের আস্থা পুনর্গঠনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com