রাঙামাটি-খাগড়াছড়িতে অবরোধে বন্ধ সড়ক যোগাযোগ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩ বার
রাঙামাটি-খাগড়াছড়িতে অবরোধে বন্ধ সড়ক যোগাযোগ

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সড়ক ও নৌপথে অর্ধদিবস অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শনিবার সকাল থেকে জনজীবনে প্রভাব পড়েছে। ভোর থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। খাগড়াছড়ি থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি। বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ, গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ এবং কোথাও গাছ কেটে চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন অবরোধকারীরা। তবে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। কাপ্তাই লেকেও লঞ্চ চলাচলে অবরোধের প্রভাব পড়েনি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’-এর ডাকে শনিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলার কথা। সাজেকে সড়ক অবরোধ কর্মসূচিতে হামলা, লাঠিপেটা এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে অবরোধের ডাক দেওয়া হয়েছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সাজেকের বাসিন্দাদের বিভিন্ন দাবির প্রতি সংহতি জানানোও কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছে তারা।

অবরোধের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির মধ্যবর্তী পথে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষ। জরুরি কাজ, চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে যাঁদের এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাওয়ার কথা ছিল, তাঁদের অনেকেই যানবাহন না পেয়ে যাত্রা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন। সাপছড়ি এলাকার বাসিন্দা ফিজিরিক্কি চাকমা জানান, সকালে তাঁর রাঙামাটি বাজারে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় তিনি যেতে পারেননি। তাঁর এই অভিজ্ঞতা অবরোধের বাস্তব প্রভাবের একটি চিত্র তুলে ধরে, যেখানে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনও ব্যাহত হচ্ছে।

রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কের বিভিন্ন স্থানে সকাল থেকেই অবরোধকারীদের অবস্থান দেখা যায়। রাঙামাটি সদরের কুতুকছড়ির ধর্মঘর এলাকা এবং সাপছড়ি খামারপাড়ায় গাছের গুঁড়ি ফেলে ও আগুন জ্বালিয়ে সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। কুতুকছড়ি হাফ বাজার থেকে ধর্মঘর পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিলও হয়েছে। কয়েকটি স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়। এসব কারণে সড়কটিতে যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, রাঙামাটি শহরের বনরূপা ও কল্যাণপুর বাজারসহ অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কেও বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করেছে। ওই সড়কে চলাচলকারী অটোরিকশাচালক মো. সেলিম জানান, সকালে রাঙামাটি থেকে বেশ কয়েকটি অটোরিকশা এবং পাহাড়িকা বাস চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সহসাধারণ সম্পাদক মো. ইউছুপও এই পথে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে বাস চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে বলে তিনি জানান।

খাগড়াছড়ি শহর ও আশপাশের এলাকাতেও অবরোধের প্রভাব স্পষ্ট ছিল। শহরের চেঙ্গী ব্রিজ ও স্বনির্ভর এলাকা, খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের কৃষি গবেষণা এলাকা এবং চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের গুইমারা জোড়াব্রিজ এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন অবরোধকারীরা। চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের সাপমারা এলাকায় গাছ কেটে সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরির খবর পাওয়া গেছে। শহরের কিছু এলাকায় অল্পসংখ্যক অটোরিকশা চলাচল করলেও দূরপাল্লার বাসের স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ ছিল।

ঢাকা থেকে রাতে ছেড়ে আসা বাসগুলোকে পুলিশি পাহারায় খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন খাগড়াছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কায় কিসলু। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি বাস দেরিতে পৌঁছানোর কারণে রামগড়ে অবস্থান করছিল। সেগুলোকে দুপুর ১২টার পর খাগড়াছড়িতে আসার জন্য বলা হয়েছে। শহরের কয়েকটি স্থানে পিকেটাররা টায়ার জ্বালিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের ধাওয়া দেন। তাঁর দাবি, ওই সময় পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত ছিল।

রাঙামাটি কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মোখলেছুর রহমানও জানান, অবরোধকে কেন্দ্র করে তখন পর্যন্ত কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ ও যান চলাচল বন্ধ থাকায় পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন, সাজেকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। সেখানে নতুন করে পিকেটিংয়ের খবর পাওয়া না গেলেও যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল।

ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা বলেছেন, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে অবরোধ কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করছেন। তবে বেতবুনিয়া এলাকায় পিকেটিংয়ের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের কর্মীদের বাধা দিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। কর্মসূচি ঘোষণার আগে বৃহস্পতিবার সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্মল চাকমার সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অবরোধের কথা জানানো হয়। এতে পার্বত্য চট্টগ্রামের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংগঠন এবং রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির যানবাহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। সংগঠনটি অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন এবং সাংবাদিকদের গাড়ি অবরোধের আওতামুক্ত রাখার কথা জানিয়েছে।

অবরোধের পেছনে থাকা সাংগঠনিক পরিচয় নিয়েও ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ মূলত ইউপিডিএফ-সমর্থিত একটি সংগঠন। তবে ইউপিডিএফের এক সদস্য এই দাবি অস্বীকার করেছেন। ফলে সংগঠনটির সঙ্গে ইউপিডিএফের সম্পর্ক নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রয়েছে। এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া না গেলে একটি পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

বর্তমান অবরোধের পেছনে রয়েছে সাজেককে ঘিরে কয়েক দিন ধরে চলা উত্তেজনা। গত বুধবার সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন তিন দফা দাবিতে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দেয়। এটি সংগঠন দুটির তৃতীয় দফা অবরোধ বলে জানা গেছে। তাদের অন্যতম দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা-সমর্থিত অংশের সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া। তবে জনসংহতি সমিতি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সংগঠনটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমার দাবি, সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও হয়রানির বিষয়টি আড়াল করতেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। অন্যদিকে, ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও সংগঠনটি অস্বীকার করেছে। ফলে সাজেকের পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন বুধবার সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীর সই করা গণবিজ্ঞপ্তিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার মধ্যে পর্যটকদের নিরাপদে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশনার পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পর্যটকেরা সাজেক ছাড়তে শুরু করেন। তবে ফেরার পথে উজো বাজার এলাকায় তাঁদের গাড়িবহর অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়ে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বাধা সরিয়ে দিলে গাড়িবহর এগিয়ে যায়।

এরপর বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে সাজেক এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা পর্যটক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছেন। ইউপিডিএফ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই সাজেকে আটকে পড়া ২ হাজার ৯৩৩ পর্যটককে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছে দেওয়া হয়। পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির গুরুতর দিকটি সামনে আসে।

শনিবারের অবরোধের কারণে কাপ্তাই লেকে লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও সড়কপথে যোগাযোগের বিঘ্ন স্থানীয় মানুষের চলাচল ও পরিবহনব্যবস্থাকে চাপে ফেলেছে। বিশেষ করে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়ক বন্ধ থাকায় দুই জেলার মধ্যে যাতায়াতকারী যাত্রীদের বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। দুপুর ১২টায় কর্মসূচি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এরপর সড়কে যান চলাচল কখন পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।

পার্বত্য অঞ্চলের এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, পর্যটকদের সুরক্ষা এবং জরুরি সেবা নির্বিঘ্ন রাখার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে অবরোধের কারণ, সাজেকের বাসিন্দাদের দাবি এবং সশস্ত্র সংঘাতের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানোর অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সড়ক অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল ও জীবিকা যাতে অযথা বিপর্যস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সংযম, কার্যকর সংলাপ এবং আইনসম্মত পদক্ষেপই পার্বত্য এলাকার উত্তেজনা কমিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com