প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর অংশে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস পাশের পানিভর্তি খাদে পড়ে তিনজন নিহত হয়েছেন। এ দুর্ঘটনায় আরও ১৬ জন আহত হয়েছেন। গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনায় এক্সপ্রেসওয়ের ওই এলাকায় কিছু সময়ের জন্য আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দিবাগত রাত ৩টার পর শ্রীনগর উপজেলার হাসাড়া এলাকায় এক্সপ্রেসওয়ের ঢাকামুখী লেনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা দর্শনা পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস কাভার্ড ভ্যানকে ওভারটেক করার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
দুর্ঘটনায় নিহত তিনজনের মধ্যে একজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি চুয়াডাঙ্গার রুকুনুজ্জামান রঞ্জু, বয়স ৫৫ বছর। নিহত অপর দুজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার করা মরদেহ হাইওয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, রাতের নির্জন সময়ে বাসটি ঢাকার দিকে যাচ্ছিল। পথে হাসাড়া এলাকায় একটি কাভার্ড ভ্যানকে অতিক্রম করার সময় বাসটির গতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এরপর বাসটি সড়কের রেলিংয়ে ধাক্কা দিয়ে সেটি ভেঙে ফেলে। পরে সার্ভিস লেন অতিক্রম করে রাস্তার পাশের পানিভর্তি খাদে পড়ে যায়।
বাসটি খাদে পড়ে যাওয়ার পর যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ও হুড়োহুড়ি শুরু হয়। অন্ধকার রাত এবং পানিভর্তি খাদে বাস পড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজও চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে শ্রীনগর ফায়ার স্টেশনের দুটি উদ্ধারকারী ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। উদ্ধারকারীরা বাসের ভেতরে আটকে থাকা ও আহত যাত্রীদের বের করে আনার চেষ্টা করেন।
ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারীরা ১১ জনকে উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে করে শ্রীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠান। আরও পাঁচজনকে ঘটনাস্থলেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা গুরুতর কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে রাতের ওই দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা হয়।
দুর্ঘটনায় আহত ১৬ জনের মধ্যে হৃদয় (৩০), শাহিন আক্তার (৩২), নূর ইসলাম (৫৫), ইমরান (২৭), গিলবাড সরকার (৫৫), তরিকুল ইসলাম (৩৬), সাইফুল ইসলাম (৪০), মিরাজুল ইসলাম (২৮), রফিকুল ইসলাম (৩৫), অনিফিন (১৭), সন্দীপন বসু (৪০), ইকরাম (৪০), রায়হান (২১), হাসিব (২২), তিশা (২৪) ও বোরহান উদ্দিন (৫৫) রয়েছেন। আহতদের বাড়ি চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, ঢাকা ও মাগুরার বিভিন্ন এলাকায় বলে জানা গেছে।
দুর্ঘটনার পর নিহত ও আহতদের পরিচয় সামনে আসায় স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। গভীর রাতে দূরপাল্লার বাস দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই নিজেদের স্বজনের খোঁজ নিতে হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। যাত্রীদের কেউ কর্মসূত্রে, কেউ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে এবং কেউ ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে ওই বাসে যাত্রা করছিলেন। একটি স্বাভাবিক যাত্রা মুহূর্তেই দুর্ঘটনায় পরিণত হওয়ায় স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে উৎকণ্ঠা ও শোক।
মুন্সীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকাগামী দর্শনা পরিবহনের বাসটি একটি কাভার্ড ভ্যানকে ওভারটেক করার সময় বেপরোয়া গতির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারায়। এরপর বাসটি সড়কের রেলিং ভেঙে সার্ভিস লেন অতিক্রম করে পাশের পানিভর্তি খাদে পড়ে যায়।
প্রাথমিকভাবে অতিরিক্ত গতি ও ওভারটেকিংয়ের সময় নিয়ন্ত্রণ হারানোকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ কারণ তদন্তের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হতে পারে। বাসটির গতি কত ছিল, চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না এবং দুর্ঘটনার সময় সড়কের পরিস্থিতি কেমন ছিল—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার যোগাযোগে এ সড়কের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন এই সড়ক ব্যবহার করে। ফলে সড়কটিতে দ্রুতগতির যান চলাচলও নিয়মিত ঘটনা।
তবে দ্রুতগতির সড়কে ওভারটেকিংয়ের সময় সামান্য ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে রাতের বেলায় দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় চালকদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং অন্য যানকে অতিক্রম করার সময় পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সড়ক দুর্ঘটনায় একটি মানুষের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের সদস্য হারানোর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং মানসিক স্থিতিশীলতাও জড়িয়ে থাকে। একজন কর্মজীবী মানুষ দুর্ঘটনায় মারা গেলে তাঁর ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরা হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যেতে পারেন। আহতদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও কর্মক্ষমতা হারানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধকে শুধু যানবাহন নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে না দেখে মানবিক ও সামাজিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা জরুরি।
শ্রীনগরের হাসাড়া এলাকায় রাতের এই দুর্ঘটনা আবারও মহাসড়কে নিরাপদ গতির গুরুত্ব সামনে এনেছে। বিশেষ করে দূরপাল্লার পরিবহনে চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা এবং প্রতিযোগিতামূলকভাবে ওভারটেকিংয়ের প্রবণতা এড়িয়ে চলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে পরিবহন মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও চালকদের কর্মঘণ্টা ও যানবাহনের ফিটনেসের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত উপস্থিতি এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠানোর উদ্যোগ অনেকের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গভীর রাতে দুর্ঘটনা ঘটায় ঘটনাস্থলে দ্রুত উদ্ধারকারী দল পৌঁছানো এবং পানিভর্তি খাদ থেকে যাত্রীদের বের করে আনা ছিল অত্যন্ত জরুরি। উদ্ধার কার্যক্রমের পর মরদেহগুলো হাইওয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এদিকে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত ও স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এবং দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আহতদের চিকিৎসা ও তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একটি বাসভর্তি মানুষ রাতের যাত্রায় ঢাকার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের অনেকের কাছে হয়তো ছিল পরদিনের কাজ, পরিবারের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা কিংবা নতুন কোনো প্রত্যাশা। কিন্তু হাসাড়ার কাছে কয়েক মুহূর্তের একটি দুর্ঘটনা তিনটি প্রাণ কেড়ে নিল এবং আরও ১৬ জনকে আহত করল। এমন ঘটনা শুধু একটি সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নয়; এটি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার একটি কঠিন বাস্তব উদাহরণ। মহাসড়কে প্রতিটি যাত্রা যেন নিরাপদে শেষ হয়, সে জন্য চালক, যাত্রী, পরিবহন মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ—সবার দায়িত্বশীল আচরণই এখন সবচেয়ে জরুরি।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত