কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের রূপরেখা দেবে বিএনপি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৯ বার
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার কর্মসংস্থান বিনিয়োগ

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। দলীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এবারের ইশতেহার কেবল ক্ষমতায় গেলে কী করা হবে—এমন প্রচলিত প্রতিশ্রুতির দলিল নয়; বরং রাষ্ট্র পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং মানবসম্পদকে আধুনিক ও উৎপাদনমুখী রূপান্তরের একটি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপিত হবে। বিশেষভাবে তরুণ ও যুবসমাজকে উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করার লক্ষ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠন এবং দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ১৯ দফা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন–২০৩০, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা, জুলাই জাতীয় সনদ এবং বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা—এই চারটি মূল স্তম্ভকে সামনে রেখে ইশতেহারটি প্রস্তুত করা হচ্ছে। লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি দলিল তৈরি করা, যা শুধু নির্বাচনি সময়েই নয়, বরং আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার একটি দিকনির্দেশনামূলক নকশা হিসেবে কাজ করবে।

ইতোমধ্যে ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ শীর্ষক কর্মসূচির মাধ্যমে বিএনপি ইশতেহারের একটি বড় অংশ জনপরিসরে তুলে ধরেছে। গত ৭ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত আটটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে দলটি ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে দলের অঙ্গসংগঠন থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা একদিকে যেমন নীতিগত প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, অন্যদিকে জনগণের কাছে বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি সামগ্রিক চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এ উপলক্ষে প্রকাশিত নয়টি লিফলেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী, কৃষক, কর্মসংস্থান, ক্রীড়া, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি এবং দুর্নীতি দমনসহ বিভিন্ন খাতে বিএনপির পরিকল্পনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে।

দলীয় সূত্র জানায়, এবারের ইশতেহারে তরুণ প্রজন্মকে কেন্দ্রীয় জায়গায় রাখার বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরাসরি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তার পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে এবং সেই মতামতের আলোকে ইশতেহারে সংযোজন ও বিয়োজন চলছে। দলের একজন উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এবারের ইশতেহার হবে বাস্তবমুখী, সময়োপযোগী এবং তরুণদের প্রত্যাশা ও সম্ভাবনাকে সামনে রেখে প্রণীত। তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি ও বক্তব্য ইশতেহারের ভাষা ও কাঠামোতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে।” নির্বাচনি প্রচার শুরু হলে একটি বড় রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার প্রস্তুতি রয়েছে।

ইশতেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হচ্ছে ‘তারুণ্যের রূপরেখা’। সারা দেশে বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত তারুণ্য সেমিনার ও মতবিনিময় সভাগুলো থেকে উঠে আসা প্রস্তাব, চাওয়া-পাওয়া ও বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো এই অধ্যায়ে সংযোজন করা হয়েছে। তরুণদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরা হচ্ছে। ইশতেহারে ঘোষণা আসছে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রথম ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। পাশাপাশি চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত শিক্ষিত বেকারদের জন্য বেকার ভাতা চালুর কথাও উল্লেখ থাকবে। প্রতিটি জেলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তুলতে আর্থিক সহায়তা, স্টার্টআপ ফান্ড, আইটি ও আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ, বিদেশে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স গঠনের প্রতিশ্রুতিও এতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।

অর্থনীতি ও বিনিয়োগ প্রসঙ্গে বিএনপি মনে করছে, প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ নতুন মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে, ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ শিল্প ও সেবা খাতে প্রবেশ করছে। এই বাস্তবতায় শিল্পায়ন, আইটি ও সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়। তাই ইশতেহারে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। যারা ইতোমধ্যে দেশে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।

ডিজিটাল অর্থনীতি ও ই-কমার্সকেও গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। ইশতেহারে উল্লেখ থাকছে, আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম যেমন আলিবাবা ও অ্যামাজনের মাধ্যমে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। একই সঙ্গে ফ্রিল্যান্সারদের বৈধ লেনদেন নিশ্চিত করতে পেপ্যাল ও ওয়াইজ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে তরুণদের বৈদেশিক আয়ের পথ আরও সহজ হয়।

রাষ্ট্র সংস্কার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে ইশতেহারে ৩১ দফার আলোকে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি এতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাতিল, পেপার ব্যালটে ভোট, জুডিশিয়াল কমিশন গঠন ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনঃপ্রবর্তনের বিষয়গুলোও উল্লেখ করা হচ্ছে। পাশাপাশি গত ১৫ বছরে অর্থপাচার ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার আইনানুগ উদ্যোগের ঘোষণাও থাকছে।

কৃষি, পরিবেশ ও নদী পুনরুদ্ধার ইশতেহারের আরেকটি বড় অংশ। বিএনপির মতে, কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে কৃষিকে অবহেলা করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। কৃষিপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষকদের কৃষি কার্ড প্রদান, উপকরণের দাম কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষিঋণ সহজীকরণ এবং ধান-চাল কেনায় স্বচ্ছতা আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনরুদ্ধার, আধুনিক তিস্তা ও গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে কোল্ড স্টোরেজ বাড়ানো এবং পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও ইশতেহারে যুক্ত হচ্ছে।

নারী, সংখ্যালঘু ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বড় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বিএনপি। নারী নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, নারী উদ্যোক্তা তহবিল, মাতৃত্বকালীন ভাতা বৃদ্ধি এবং সহিংসতা প্রতিরোধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের ঘোষণা থাকছে। প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে দেশের সব পরিবারে সম্প্রসারিত হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে নারীরা মাসিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সহায়তা পাবেন। পাশাপাশি বয়স্ক ভাতা বৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের কথাও উল্লেখ থাকছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মৌলিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিও ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষা বাজেট বাড়ানো, স্কুল পর্যায় থেকেই ব্যবহারিক ও কারিগরি শিক্ষা চালু, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপদ ক্যাম্পাস ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্যখাতে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের আদলে সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা চালু, প্রাথমিক চিকিৎসা বিনামূল্যে নিশ্চিত করা এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার দেশের মানুষের কাছে দলের আগামীর দিনের প্রতিশ্রুতি। ইশতেহার চূড়ান্ত হলে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা করে তা অনুমোদন দেওয়া হবে। দলটির বিশ্বাস, এই ইশতেহার জনগণের সামনে একটি বিকল্প ও বাস্তবসম্মত রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা তুলে ধরবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com