প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির সাবেক নেত্রী তাসনিম জারার মনোনয়নপত্রকে বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানিতে এই রায় আসে, ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তার সামনে থাকা সব আইনি বাধা দূর হলো। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের অডিটরিয়ামে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শুনানিতে নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের উপস্থিতিতে সিদ্ধান্তটি ঘোষণা করা হয়। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ঢাকা-৯ আসনের রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে, আলোচনায় এসেছে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভূমিকা, ভোটারদের প্রত্যাশা এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতার বহুমাত্রিকতা।
শনিবার সকাল থেকে প্রার্থীদের করা আপিলের ধারাবাহিক শুনানি শুরু হয়। এদিন তাসনিম জারার পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যুক্তি উপস্থাপন করা হলে কমিশন তা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করে। সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর হাস্যোজ্জ্বল তাসনিম জারা বলেন, জনসমর্থনের জোরেই তিনি প্রার্থী হিসেবে লড়াই করতে পারবেন এবং সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি আরও জানান, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতীক বরাদ্দের জন্য আবেদন করবেন এবং তার পছন্দের প্রতীক হিসেবে ফুটবল মার্কার কথা উল্লেখ করেন। এই প্রতিক্রিয়ায় তার সমর্থকরা যেমন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, তেমনি সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও কৌতূহল বেড়েছে—একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির ভিড়ে নিজস্ব জায়গা তৈরি করবেন।
পূর্বাপর প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, গত ৩ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ঢাকা জেলা প্রশাসক রেজাউল করিম তাসনিম জারার মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন। ওই সিদ্ধান্তে তার প্রার্থিতা ঝুঁকির মুখে পড়ে। তবে নির্বাচন আইনের বিধান অনুযায়ী তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই, ৫ জানুয়ারি, নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন। কমিশন সেই আপিল গ্রহণ করে শুনানির তারিখ নির্ধারণ করে। নিরপেক্ষ ও পেশাদার পদ্ধতিতে কাগজপত্র যাচাই এবং আইনগত যুক্তি বিবেচনার পর কমিশন তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ন্যায়সংগততা ও স্বচ্ছতার প্রতিফলন বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
এ বছর মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে আপিলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আপিল করার শেষ দিন পর্যন্ত মোট ৬৪৫টি আবেদন জমা পড়ে। ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক আপিলের শুনানি নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে সময়ের মধ্যে সব আপিল নিষ্পত্তি করা যায়। কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল শুনানি চলবে। এরপর ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন এবং ২১ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি থেকে, যা চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ ফেব্রুয়ারি। এই সময়সূচি ধরে রেখে কমিশনের কার্যক্রম এগোচ্ছে, যা নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করার বার্তা দিচ্ছে।
ঢাকা-৯ আসনটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নগরভিত্তিক ভোটার, তরুণ ও পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ এবং সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় নাগরিকদের উপস্থিতি এই আসনের বৈশিষ্ট্য। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাসনিম জারার মাঠে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বহুমাত্রিক করেছে। দলীয় প্রার্থীদের পাশাপাশি একজন পরিচিত মুখ, নাগরিক রাজনীতিতে সক্রিয়তা এবং ইস্যুভিত্তিক বক্তব্য দিয়ে তিনি আলাদা করে নজর কাড়ছেন। তার বক্তব্যে নাগরিক সেবা, অবকাঠামো, পরিবহন, পরিবেশ, তরুণদের কর্মসংস্থান ও স্বচ্ছতা—এসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে বলে সমর্থকরা জানান।
মনোনয়ন বৈধ হওয়ার পর প্রতীক বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং প্রচারণার কৌশলগত অংশ। প্রতীক সাধারণ ভোটারের কাছে প্রার্থীর পরিচয় ও বার্তার বাহক। ফুটবল মার্কা পছন্দ করার কথা বলায় তার প্রচারণা যে ক্রীড়া, ঐক্য ও মাঠের লড়াইয়ের প্রতীকী ভাষায় সাজতে পারে—এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে। তবে প্রতীক বরাদ্দ কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য প্রতীক ও পরিচিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দলীয় প্রতীকের সংগঠিত কাঠামো তার পেছনে থাকে না।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও আলোচনার অবকাশ রয়েছে। একদিকে রিটার্নিং কর্মকর্তার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে কমিশনের আপিল শুনানিতে ভিন্ন রায়—এই দুই স্তরের প্রক্রিয়া নির্বাচন ব্যবস্থায় ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আপিলের মাধ্যমে প্রার্থী তার সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ পান এবং কমিশনের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই প্রার্থিতার আইনি ভিত্তি স্থির করে। তাসনিম জারার ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে। এতে ভবিষ্যৎ আপিলকারীদের জন্যও দৃষ্টান্ত তৈরি হলো যে সঠিক নথি ও যুক্তি থাকলে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা সম্ভব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সমর্থকরা একে ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিজয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। আবার সমালোচকরা নির্বাচন ব্যবস্থার সামগ্রিক চ্যালেঞ্জের দিকে ইঙ্গিত করেছেন—যেখানে যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে জটিলতা ও ব্যাখ্যার ভিন্নতা প্রার্থীদের অনিশ্চয়তায় ফেলতে পারে। তবে উভয় পক্ষই একমত যে কমিশনের স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নির্বাচনী বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক।
ভোটারদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত বহুমুখী হবে, ভোটারের বিকল্প তত বাড়বে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতি দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে নাগরিক ইস্যুকে সামনে আনতে পারে। তাসনিম জারার প্রচারণায় যদি স্থানীয় সমস্যা ও বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি প্রাধান্য পায়, তবে তা ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে। তবে নির্বাচনী বাস্তবতায় সংগঠন, মাঠপর্যায়ের কর্মী ও প্রচারের বিস্তৃতি বড় চ্যালেঞ্জ—যা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রায়শই মোকাবিলা করতে হয়।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রচারণা শুরুর আগেই প্রার্থীদের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। দলীয় প্রার্থীরা যেখানে আগে থেকেই সংগঠিত, সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য সময় ব্যবস্থাপনা ও বার্তা পৌঁছানোই মূল পরীক্ষা। তাসনিম জারা ইতিমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি এবং নাগরিক সংলাপের মাধ্যমে সমর্থন তৈরির চেষ্টা করছেন বলে তার ঘনিষ্ঠরা জানান। তবে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে মাঠের রাজনীতি, ভোটারদের আস্থা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের কৌশলের ওপর।
সব মিলিয়ে, তাসনিম জারার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার ঘটনা কেবল একজন প্রার্থীর আইনি সাফল্য নয়; এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আপিল ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতার সম্ভাবনাকে সামনে আনে। ঢাকা-৯ আসনের ভোটাররা এবার দলীয় প্রার্থীদের পাশাপাশি একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মসূচি ও প্রতিশ্রুতি বিচার করার সুযোগ পাবেন। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—এই আসনে লড়াই হবে বার্তা, সংগঠন ও আস্থার। শেষ পর্যন্ত ভোটাররাই নির্ধারণ করবেন, কার হাতে যাবে তাদের প্রতিনিধিত্ব।