প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়ার বিভিন্ন এলাকায় একযোগে চালানো সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে অন্তত আটজন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। রোববার দিনভর পুলিশ ও সন্ত্রাস দমন বিভাগ (সিটিডি) যৌথভাবে এই অভিযান পরিচালনা করে। বান্নু, খাইবার এবং পেশোয়ারের শহরতলির জহির গড়ি—এই তিনটি স্পর্শকাতর অঞ্চলে পরিচালিত অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা একাধিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম জিও নিউজসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
খাইবার পাখতুনখোয়া দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানের অন্যতম অস্থিতিশীল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এই প্রদেশে বিভিন্ন উগ্রবাদী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে বলে দাবি করে থাকে দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পুলিশের ওপর ধারাবাহিক হামলা, চেকপোস্টে আক্রমণ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে সহিংস কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটেই রোববারের এই সমন্বিত অভিযানকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় পুলিশ অফিসের (সিপিও) বরাতে জানানো হয়েছে, বান্নু জেলায় স্থানীয় পুলিশ ও সিটিডির যৌথ অভিযানে দুইজন সন্ত্রাসী নিহত হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, এই সন্ত্রাসীরা এর আগে শেখ লিন্ডাক এবং ফাতাহ খেল এলাকার দুটি পুলিশ পোস্টে হামলায় জড়িত ছিল। ওই হামলাগুলোতে পুলিশের একাধিক সদস্য আহত হয়েছিলেন এবং সরকারি স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি হয়। অভিযানের সময় তীব্র গোলাগুলির পর দুই সন্ত্রাসী নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং বেশ কয়েকটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে, যেগুলো তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অন্যদিকে, খাইবার জেলার আরেকটি অভিযানে তিন সন্ত্রাসী নিহত হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা বাহিনী নির্দিষ্ট এলাকায় অভিযান চালায় এবং সন্ত্রাসীদের অবস্থান ঘিরে ফেলে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে তিনজন সন্ত্রাসী নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে তিনটি রাইফেল উদ্ধার করা হয়েছে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে তারা একটি সমন্বিত ও সশস্ত্র হামলার পরিকল্পনা করছিল।
পেশোয়ারের শহরতলির জহির গড়িতেও একই দিনে আরেকটি অভিযান পরিচালিত হয়। সেখানে পুলিশের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের সংঘর্ষে আরও তিনজন নিহত হয়। পুলিশ জানায়, নিহত সন্ত্রাসীরা একটি গোপন আস্তানায় অবস্থান করছিল এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। অভিযানের সময় কয়েকজন সহযোগী পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তাদের শনাক্ত করতে অভিযান ও তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এই অভিযানে বড় ধরনের নাশকতা পরিকল্পনা নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধার করা অস্ত্র, যোগাযোগ সরঞ্জাম ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “আমরা কেবল সন্ত্রাসীদের নির্মূলই করছি না, তাদের যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থায়নের উৎস শনাক্ত করতেও কাজ করছি।”
এই ঘটনাগুলো এমন এক সময়ে ঘটল, যখন পাকিস্তান জুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিভিন্ন প্রদেশে পুলিশের ওপর হামলা, ধর্মীয় স্থাপনা ও সরকারি দপ্তর লক্ষ্য করে আক্রমণের ঘটনা বেড়েছে। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশে সহিংসতার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব এবং সীমান্তপথে নজরদারির ঘাটতি এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মানবিক দিক থেকেও এই পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের। সহিংসতার ভয়ে অনেক সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায়ই অভিযান ও গোলাগুলির শব্দে আতঙ্কে রাত কাটাতে হয়। স্কুল, বাজার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। যদিও নিরাপত্তা বাহিনী দাবি করছে, তারা সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে অভিযান পরিচালনা করছে।
আন্তর্জাতিক মহলও পাকিস্তানের এই সন্ত্রাসবিরোধী প্রচেষ্টা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সন্ত্রাস দমনে কার্যকর ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন তারা।
পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করা হবে। রোববারের এই অভিযানকে সেই নীতির বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরছেন সরকারি কর্মকর্তারা। তবে একই সঙ্গে তারা স্বীকার করছেন, সন্ত্রাসবাদ নির্মূল একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া, যার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, খাইবার পাখতুনখোয়ার বান্নু, খাইবার ও জহির গড়িতে পরিচালিত এই অভিযানে আট সন্ত্রাসীর নিহত হওয়া পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য তাৎক্ষণিক সাফল্য হলেও, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এসব অভিযানের মাধ্যমে সহিংসতার চক্র ভেঙে পড়বে এবং তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারবে।