প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে দেশ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই গণভোটকে কেন্দ্র করে জনমনে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করতে ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তাঁর এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে আর্থিক খাত এবং নাগরিক সমাজে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত ‘ব্যাংকার্স সভা’য় গভর্নর এই পরামর্শ দেন। বৈঠকে ব্যাংক খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনসহ একাধিক এমডি উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় দেশের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য ঝুঁকি, নগদ লেনদেনের তদারকি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়।
বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে আগে থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকলেও ‘গভর্নর কর্তৃক সরাসরি উপস্থাপিত হবে’ শিরোনামে একটি এজেন্ডা অন্তর্ভুক্ত ছিল। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক এমডির ভাষ্য অনুযায়ী, এই অংশেই গভর্নর আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন। বিশেষ করে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের গুরুত্ব এবং এটি বাস্তবায়িত না হলে রাষ্ট্র ও সমাজে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে জনগণকে অবহিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের আলোকে গণভোটের বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা শুধু সরকারের নয়, বরং সমাজের সব অংশীজনের দায়িত্ব। ব্যাংকগুলো দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় এই দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। তিনি উল্লেখ করেন, কোনো বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও যদি গণভোট ইস্যুতে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে, তবে ব্যাংকগুলো তাদের সিএসআর তহবিল থেকে সহায়তা দিতে পারে। তাঁর মতে, এটি রাজনৈতিক প্রচারণা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি বিষয়ে জনগণকে তথ্যভিত্তিক সচেতন করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত।
একই সঙ্গে গভর্নর নির্বাচনকালীন আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সতর্কতার নির্দেশ দেন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডলার কিনছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৭৫ কোটি ডলার কেনার বিপরীতে বাজারে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করা হয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ যেন কোনোভাবে অপচয় বা অনিয়মের শিকার না হয়, সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তিনি।
নির্বাচনকে সামনে রেখে কালো টাকা বা অবৈধ অর্থের ব্যবহার ঠেকাতে আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট বিএফআইইউ নগদ লেনদেনের ওপর নজরদারি জোরদার করেছে। সম্প্রতি জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ১০ লাখ টাকার বেশি যে কোনো লেনদেনের তথ্য মাসিকের পরিবর্তে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে। একটি সপ্তাহ শেষ হওয়ার পর তিন কর্মদিবসের মধ্যেই এই তথ্য জমা দিতে হবে। আগে যেখানে একটি মাস শেষ হওয়ার পর পরবর্তী মাসের ২১ তারিখ পর্যন্ত সময় পাওয়া যেত, সেখানে এখন সময়সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভোটের সময় অবৈধ অর্থের প্রবাহ রোধ করতেই এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে ব্যাংক খাতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ খেলাপি ঋণ নিয়েও আলোচনা হয়। গভর্নর জানান, দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ গত ডিসেম্বর শেষে কিছুটা কমে মোট ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। তিন মাস আগে, গত সেপ্টেম্বর শেষে এই হার ছিল ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। আদায় কার্যক্রম জোরদার করে আগামী মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের জন্য ঘোষিত বিশেষ সুবিধা বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেন গভর্নর। তিনি বলেন, এ জন্য গঠিত কমিটি থেকে ঋণ পুনঃতপশিলের বিষয়ে নির্দেশনা পাঠানো হলেও অনেক ব্যাংক তা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না। এই অবস্থান থেকে সরে এসে সবাইকে নীতিমালা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, বৈধ পথে প্রবাসী আয় পাঠানোর প্রবণতা বাড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হচ্ছে। ডলারের বিনিময় হারও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। সামনে রমজান মাস ও দুই ঈদকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনোভাবেই যেন রেমিট্যান্সের অপব্যবহার বা হুন্ডির মতো অবৈধ চ্যানেলে অর্থ পাচারের সুযোগ তৈরি না হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান পরে সাংবাদিকদের জানান, ব্যাংকগুলোর এমডিদের সঙ্গে বৈঠকে গভর্নর খেলাপি ঋণ কমানো, বৈদেশিক এক্সচেঞ্জ হাউস পরিচালনা এবং নির্বাচনকালীন আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষ করে বিদেশে পরিচালিত এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোকে দেশ থেকে অতিরিক্ত অর্থ পাঠানো ছাড়াই কীভাবে লাভজনক ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সার্বিকভাবে এই বৈঠক এবং গভর্নরের বক্তব্য গণভোট, নির্বাচন ও অর্থনীতির পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। একদিকে যেমন জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সিএসআর তহবিল ব্যবহারের প্রস্তাব সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে নির্বাচনকালীন আর্থিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ব্যাংকগুলো এই নির্দেশনা ও পরামর্শ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে এবং এর প্রভাব কীভাবে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশে প্রতিফলিত হয়।