শীতের সকালে সংগ্রামের গল্প: রাজশাহীতে নারীদের শাকের বাজার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪০ বার
রাজশাহীতে নারীদের শাকের বাজার

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শীতের কনকনে সকাল। হিমেল বাতাসে রাজশাহীর মাঠ-ঘাট তখনও কুয়াশার চাদরে ঢাকা। শহরের মানুষ যখন গরম কাপড়ে নিজেকে মুড়িয়ে দিনের শুরু করছে, ঠিক তখনই ১২ থেকে ১৪ জন নারী নীরবে ছুটে যান কৃষিজমির দিকে। শৈত্যপ্রবাহ তাদের দমাতে পারে না। কারণ তাদের হাতে সময় কম, কাজ বেশি। মটর, খেসারি, বুট, লাউ ও কুমড়ার ক্ষেতে নেমে শুরু হয় শাক তোলার ব্যস্ততা। এই শাকই তাদের জীবনের অবলম্বন, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ, অসুস্থ মুরব্বিদের ওষুধ আর প্রতিদিনের খাবারের নিশ্চয়তা।

এই নারীদের গন্তব্য রাজশাহী মহানগরীর সিঅ্যান্ডবি মোড়ের বাজার। শীতকাল এলেই এখানে গড়ে ওঠে এক ভিন্নধর্মী বাজার, যা স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘নারীদের শাকের বাজার’ নামে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত পর্যন্ত ফুটপাতে পাটি পেতে বসেন তারা। ডালিতে সাজানো থাকে তাজা শাকসবজি। কেউ কুচি কুচি করে শাক কাটছেন, কেউ আবার ক্রেতার সঙ্গে দরদাম করছেন। তাদের হাতের ছোঁয়ায় সাধারণ শাক হয়ে ওঠে প্রস্তুত রান্নার উপযোগী পণ্য।

এই বাজারের বিশেষত্ব শুধু নারীদের উপস্থিতি নয়, বরং তাদের শ্রমের ধরন ও সততা। শাকগুলো তারা নিজেরাই চাষ করেন বা চরের জমিতে উৎপাদিত ফসল সংগ্রহ করেন। কোনো রাসায়নিক সার বা কীটনাশকের ব্যবহার নেই বলেই ক্রেতাদের বিশ্বাস। তাই শহরের অনেক মানুষ দূরদূরান্ত থেকেও এই বাজারে ছুটে আসেন। তাদের কাছে এটি শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়, বরং বিশ্বাসের এক নাম।

বাজারে ভাতি বা বইট্টা শাক বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৬০ টাকায়, খেসারি শাক ১০০ টাকায় আর বুটের শাক ১২০ টাকায়। সরিষা, রাই, মেথি, মটর, শজিনা, লাউসহ অন্যান্য জাতের শাক বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে। দাম তুলনামূলক কম হলেও বিক্রির পরিমাণ বেশি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটানা কাজ করে প্রতিদিন গড়ে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা আয় করেন তারা। এই আয় দিয়েই চলে তাদের সংসার, সন্তানদের স্কুলের বেতন, খাতা-কলম কেনা এবং পারিবারিক চিকিৎসা ব্যয়।

এই সংগ্রামী নারীদের একজন পলি খাতুন। বয়সের ছাপ পড়েছে মুখে, তবে চোখে লুকানো দৃঢ়তা। সিঅ্যান্ডবি মোড়ের জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের সামনে বসে তাকে দেখা যায় শাক কুচি কুচি করে কাটতে। কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, “আমরা সবাই শ্রীরামপুর এলাকার মানুষ। এখানে ১৪ জন মিলে শাক বিক্রি করি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বসে থাকি। যা বিক্রি হয়, তা নিয়েই রাতে বাড়ি ফিরি। আল্লাহর রহমতে দিন শেষে যা থাকে, তাতে ভালোভাবেই সংসার চলে।”

পলির মতোই আরেক সংগ্রামী নারী পারভীন বেগম। চল্লিশের কোঠা পেরোনো এই নারী জীবনের কঠিন বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি বলেন, “চরের মাঝে যে ফসল হয়, সেগুলো আমরা নিজেরাই তুলে আনি। প্রতিদিন ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকার শাক বিক্রি হয়। এতে খরচ বাদ দিয়েও কিছু লাভ থাকে। এই আয়ে আমরা ভালোই আছি, কারও কাছে হাত পাততে হয় না।” তার কণ্ঠে গর্ব, কারণ এই আয় তার নিজের শ্রমের ফসল।

এই বাজার শুধু বিক্রেতাদের জীবনের গল্পই বলে না, ক্রেতাদের কাছেও এটি এক স্বস্তির জায়গা। ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম নিয়মিত এখান থেকে শাক কেনেন। শাক হাতে নিয়ে তিনি বলেন, “শীতজুড়ে এখানে শাক পাওয়া যায়। সবচেয়ে ভালো লাগে, নারীরা শাক কুচি কুচি করে কেটে বিক্রি করেন। বাড়িতে গিয়ে আর কাটাকাটির ঝামেলা নেই। তাছাড়া এগুলো একদম তরতাজা আর বিষমুক্ত। রান্না করে খেতে অনেক মজা লাগে।”

রাজশাহীর এই নারীদের শাকের বাজার আসলে এক নীরব সামাজিক পরিবর্তনের গল্প। গ্রামীণ নারীরা এখানে শুধু বিক্রেতা নন, তারা উদ্যোক্তা। নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নিজেরাই বাজারজাত করছেন। মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য নেই। ফলে ন্যায্য দাম পাচ্ছেন তারা, আবার শহরের মানুষও পাচ্ছেন ভালো মানের পণ্য। এই সরাসরি সংযোগই তাদের টিকে থাকার শক্তি।

শীতের মৌসুম এলেই এই বাজার জমে ওঠে। তবে শীতের তীব্রতা বাড়লেও তাদের কাজ থেমে থাকে না। কনকনে ঠান্ডায় জমিতে শাক তুলতে গিয়ে হাত-পা জমে আসে, তবুও তারা থেমে যান না। কারণ তাদের কাছে কাজ থামা মানে সংসারের চাকা থেমে যাওয়া। এই বাস্তবতাই তাদের প্রতিদিন নতুন করে লড়াইয়ে নামতে অনুপ্রাণিত করে।

সমাজের প্রান্তিক এই নারীরা নীরবে দেখিয়ে দিচ্ছেন, আত্মনির্ভরতার মানে কী। সরকারি বা বেসরকারি কোনো বড় সহায়তা ছাড়াই তারা নিজেদের শক্তিতে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের এই উদ্যোগ যদি আরও পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তাহলে এটি শুধু একটি বাজার নয়, বরং নারীর ক্ষমতায়নের একটি সফল মডেল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

রাজশাহীর সিঅ্যান্ডবি মোড়ের এই শাকের বাজার তাই শুধু সবজি কেনাবেচার জায়গা নয়। এটি শ্রমজীবী নারীদের সাহস, সংগ্রাম আর আত্মমর্যাদার প্রতীক। শীতের সকালে জমি থেকে শুরু করে রাতের অন্ধকারে বাজার গুটিয়ে ঘরে ফেরা—এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তারা প্রতিদিনই প্রমাণ করছেন, জীবনযুদ্ধের ময়দানে তারাও একেকজন যোদ্ধা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত