কালীগঞ্জে মাটি খুঁড়তেই মিলল অবিস্ফোরিত গ্রেনেডের আতঙ্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার
কালীগঞ্জে অবিস্ফোরিত গ্রেনেড উদ্ধার

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে বাড়ি নির্মাণের প্রস্তুতির সময় মাটি খুঁড়তেই হঠাৎ সামনে চলে আসে ভয়ংকর এক বাস্তবতা। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা অবিস্ফোরিত দুটি হ্যান্ড গ্রেনেড উদ্ধার হওয়ায় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা। মুহূর্তেই থমকে যায় নির্মাণকাজ, স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দেয় উদ্বেগ, আর ঘটনাস্থলে ছুটে আসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

রোববার (১১ জানুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের বড় গড়িয়ালা গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। গ্রামের বাসিন্দা বাবু মিয়ার বাড়িতে নতুন ঘর নির্মাণের জন্য শ্রমিকরা সকালে মাটি খুঁড়ছিলেন। একপর্যায়ে কোদালের আঘাতে মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে দুটি গোলাকার ধাতব বস্তু। প্রথমে শ্রমিকরা বিষয়টি বুঝতে না পারলেও কিছুটা পরিষ্কার করার পর তারা বুঝতে পারেন, বস্তু দুটি সাধারণ কোনো লোহার টুকরা নয়। সঙ্গে সঙ্গে কাজ বন্ধ করে তারা বিষয়টি বাড়ির মালিক ও স্থানীয়দের জানান।

খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকাবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। অনেকেই আশঙ্কা করতে থাকেন, যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে শ্রমিক ও স্থানীয়রা দ্রুত নলডাঙ্গা পুলিশ ক্যাম্পে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ধাতব বস্তু দুটি পরীক্ষা করে সেগুলোকে অবিস্ফোরিত হ্যান্ড গ্রেনেড হিসেবে শনাক্ত করে। পরে নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলা হয় এবং যৌথ বাহিনীকে খবর দেওয়া হয়।

ঘটনাস্থলে পৌঁছে যৌথ বাহিনীর একটি বিশেষ টিম অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গ্রেনেড দুটি উদ্ধার করে। উদ্ধার প্রক্রিয়া চলাকালে স্থানীয়দের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টার জন্য পুরো এলাকা কার্যত থমকে থাকে। পরে গ্রেনেড দুটি ঝিনাইদহ সদর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের মাধ্যমে গ্রেনেড দুটি পরবর্তীতে নিষ্ক্রিয় করা হবে।

বাড়ির মালিক বাবু মিয়া ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, সকালে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির কাজ শুরু হয়েছিল। হঠাৎ শ্রমিকরা এসে জানায়, মাটির নিচে অদ্ভুত কিছু পাওয়া গেছে। কাছে গিয়ে দেখি দুটি গোলাকার ধাতব বস্তু। তখনই ভয় পেয়ে যাই। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে খবর দিই। তিনি আরও বলেন, নিজের বাড়ির উঠানে এমন বিপজ্জনক বস্তু লুকিয়ে ছিল, তা কল্পনাও করতে পারেননি। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি—এটাই সবার জন্য স্বস্তির।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গ্রেনেড উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই ঘর থেকে বের হয়ে দূরে সরে যান। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে পরিবারগুলো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকে এই এলাকায় বসবাস করছি, কিন্তু কখনো ভাবিনি মাটির নিচে এমন ভয়ংকর অস্ত্র লুকিয়ে থাকতে পারে। আল্লাহর রহমত যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।

ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সামসুল আরেফিন জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে গ্রেনেড দুটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের। সে সময় বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও যুদ্ধের কারণে অনেক অবিস্ফোরিত অস্ত্র মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, গ্রেনেড দুটি বর্তমানে থানার হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং যৌথ বাহিনীর বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের মাধ্যমে সেগুলো নিরাপদভাবে নিষ্ক্রিয় করা হবে।

পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘর্ষপূর্ণ এলাকাগুলোতে এখনো মাঝে মাঝে অবিস্ফোরিত গ্রেনেড, মর্টার শেল বা গোলাবারুদ উদ্ধার হয়। দীর্ঘদিন মাটির নিচে থাকার পরও এসব অস্ত্র মারাত্মকভাবে বিপজ্জনক থাকে। সামান্য আঘাত বা অসাবধানতায় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত অনেক অস্ত্র ও গোলাবারুদ যুদ্ধ শেষে সঠিকভাবে অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। পরবর্তীতে বাড়ি নির্মাণ, কৃষিকাজ বা সড়ক নির্মাণের সময় এসব অবিস্ফোরিত অস্ত্র বেরিয়ে আসছে। এ কারণে এমন কিছু দেখা গেলে সাধারণ মানুষকে কোনোভাবেই তা স্পর্শ না করে দ্রুত পুলিশ বা প্রশাসনকে জানানো জরুরি।

এই ঘটনায় প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। যৌথ বাহিনীর সদস্যদের পেশাদারিত্ব ও সতর্কতার প্রশংসা করেন তারা। অনেকেই বলেন, যদি শ্রমিকরা বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতেন, তাহলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।

এদিকে ঘটনার পর এলাকাবাসীর মধ্যে নিরাপত্তা সচেতনতা বেড়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা গ্রামবাসীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেন, মাটি খনন বা নির্মাণকাজের সময় যদি কোনো সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া যায়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ করে প্রশাসনকে জানাতে হবে। নিজেরা ঝুঁকি নেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়।

কালীগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন স্মৃতি ও নিদর্শনের কথা মাঝে মাঝেই শোনা যায়। তবে মাটির নিচে অবিস্ফোরিত গ্রেনেডের মতো অস্ত্র লুকিয়ে থাকা আজও মানুষের জীবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে আছে—এই ঘটনাই তার প্রমাণ। প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও দ্রুত পদক্ষেপই পারে এমন বিপদ থেকে জীবন রক্ষা করতে।

সবশেষে বলা যায়, বড় গড়িয়ালা গ্রামের এই ঘটনা শুধু একটি স্থানীয় খবর নয়, বরং এটি একটি সতর্কবার্তা। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পরেও যুদ্ধের ভয়াবহতা কোনো কোনো জায়গায় নীরবে লুকিয়ে আছে মাটির গভীরে। সেই নীরব বিপদের মুখোমুখি হয়ে আবারও প্রমাণ হলো, সচেতনতা ও দ্রুত প্রশাসনিক উদ্যোগই পারে বড় দুর্ঘটনা ঠেকাতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত