গ্রিনল্যান্ড দখলে হামলার ছক, ট্রাম্পের নির্দেশে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৯ বার
গ্রিনল্যান্ডে হামলার পরিকল্পনা ট্রাম্প

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড আক্রমণের জন্য একটি সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন—এমন খবরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ব্রিটেনভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল রোববার এক প্রতিবেদনে জানায়, ট্রাম্প বিশেষ বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের এই পরিকল্পনা প্রস্তুতের নির্দেশ দিয়েছেন। বিষয়টি সামনে আসতেই বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের আশঙ্কা—গ্রিনল্যান্ড যদি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে রাশিয়া বা চীন এই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপটিকে নিজেদের প্রভাববলয়ে নিয়ে আসতে পারে। সেই সম্ভাবনা ঠেকাতেই ট্রাম্প আগেভাগে কঠোর অবস্থান নিতে চাইছেন। ডেইলি মেইলের দাবি অনুযায়ী, এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডকে (জেএসওসি) একটি সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গ্রিনল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক কৌশলগত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হলেও দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সামরিক গুরুত্ব এটিকে পরাশক্তিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের কেন্দ্র করে তুলেছে। বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলার ফলে নতুন নৌপথ ও খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই সেখানে একটি সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করছে, যা তাদের প্রতিরক্ষা কৌশলের অংশ।

ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক নিউইয়র্কে আনার ঘটনার পর ট্রাম্প প্রশাসন আরও আক্রমণাত্মক কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ডকে ‘চীন বা রাশিয়ার দখলে যাওয়ার আগেই’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চিন্তা করছেন ট্রাম্প—এমন ভাষ্যই তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।

তবে এই সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ এই উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তাদের যুক্তি, গ্রিনল্যান্ডে সামরিক হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হতে পারে এবং কংগ্রেসের সমর্থন ছাড়া এমন পদক্ষেপ নেওয়া আইনগতভাবে টেকসই হবে না। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, বড় ধরনের সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন—এই বিষয়টি সামনে এনে তারা আপত্তি তুলেছেন।

গ্রিনল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই খবরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শুক্রবার গ্রিনল্যান্ডের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এক যৌথ বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চান না, আবার ডেনমার্কের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণেও থাকতে চান না। তারা নিজেদের গ্রিনল্যান্ডবাসী পরিচয়েই স্বাধীনভাবে বাঁচতে চান। এই বক্তব্য গ্রিনল্যান্ডের জনগণের দীর্ঘদিনের আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাকেই প্রতিফলিত করে।

এদিকে, হোয়াইট হাউসে শুক্রবার অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প নিজেই গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “আমরা গ্রিনল্যান্ডে কিছু একটা করতে যাচ্ছি, তারা পছন্দ করুক বা না করুক। কারণ আমরা যদি তা না করি, তাহলে রাশিয়া বা চীন এই দ্বীপকে দখল করবে। যুক্তরাষ্ট্র কখনোই রাশিয়া বা চীনকে প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে চায় না।” ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা অতিক্রম করেছে বলে মন্তব্য করেছেন অনেক বিশ্লেষক।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত কূটনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের আগে মিত্র দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে থাকে। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের বক্তব্য একতরফা ও চাপ সৃষ্টিমূলক বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে ডেনমার্ক, যা ন্যাটোর সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র, তাদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

ইউরোপীয় কূটনীতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। ডেনমার্ক সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য না করলেও, কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে—গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের মতামত উপেক্ষা করে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা গুরুতর আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি করতে পারে। ন্যাটোর অভ্যন্তরেও এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ইরান, কিউবা, মেক্সিকো ও চীনের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। একের পর এক কঠোর বক্তব্য ও হুমকি দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন যে একটি আক্রমণাত্মক বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করছে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যু তা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

গ্রিনল্যান্ডের সাধারণ মানুষের মধ্যেও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, অনেক গ্রিনল্যান্ডবাসী আশঙ্কা করছেন—পরাশক্তিদের এই টানাপোড়েনে তাদের শান্ত জীবন বিপর্যস্ত হতে পারে। এক স্থানীয় নাগরিক বলেন, “আমরা বড় শক্তির খেলায় দাবার গুটি হতে চাই না। আমরা শান্তিতে থাকতে চাই, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই ঠিক করতে চাই।”

সব মিলিয়ে, গ্রিনল্যান্ড আক্রমণের পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ সংক্রান্ত এই খবর সত্য হলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রিনল্যান্ড নয়, বরং পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা ও কূটনীতির জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে। আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে এই ইস্যু নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্প প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কোন পথে এগোয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় কী ভূমিকা নেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত