নতুন আমদানি নীতিতে বড় পরিবর্তন, পুরোনো গাড়ি আমদানির সুযোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২৮ বার
নতুন আমদানি নীতিতে বড় পরিবর্তন, পুরোনো গাড়ি আমদানির সুযোগ

প্রকাশ: ১২  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের আমদানি ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে নতুন আমদানি নীতি আদেশের খসড়া। ২০২৫ থেকে ২০২৮ মেয়াদের জন্য প্রস্তাবিত এই নীতিতে একদিকে যেমন আমদানি প্রক্রিয়া সহজ ও উদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে পরিবেশ, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টাও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। খসড়ায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি আমদানির সুযোগ রাখা এবং ঋণপত্র বা এলসি ছাড়াই বিক্রয় চুক্তির বিপরীতে যে কোনো পরিমাণ পণ্য আমদানির প্রস্তাব।

বর্তমানে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক আমদানির ক্ষেত্রে এলসি ছাড়া সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত পণ্য আনার সুযোগ রয়েছে। তবে নতুন খসড়া আমদানি নীতিতে আমদানির অনুমতি থাকা পণ্য এলসি ছাড়াই যেকোনো পরিমাণ আমদানির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে আমদানিকারকদের জন্য প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আমদানির ক্ষেত্রে বিদেশি বিক্রেতার সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হলেও অর্থ পরিশোধসহ সব ধরনের লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমেই হবে, ফলে আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় থাকবে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়েছে।

গত রোববার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ২০২৫-২৮ মেয়াদের নতুন আমদানি নীতি আদেশের খসড়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে খসড়ার বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয় এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয়েও আলোচনা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে গঠিত একটি আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি দীর্ঘদিন ধরে নীতিটি যুগোপযোগী করার জন্য কাজ করছে বলে জানা গেছে।

বৈঠক শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সাংবাদিকদের জানান, আমদানি নীতি আদেশে পরিবর্তন আনার বিষয়ে প্রায় এক মাস ধরে আলোচনা চলছে। তাঁর ভাষায়, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে আমদানি ব্যবস্থাকে আরও উদার ও সহজ করা, যাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যায়। তিনি বলেন, আমদানির লেনদেন পদ্ধতি, পণ্যের মান যাচাই এবং বিভিন্ন শর্ত নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা আরও জানান, প্রস্তাবগুলো উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন পেলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। খুব শিগগিরই বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সরকার এই নীতিকে দ্রুত চূড়ান্ত করতে চায়, যাতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে।

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, নতুন আমদানি নীতির প্রায় প্রতিটি পাতায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যাগ্রিমেন্টে স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে ব্যবসা সহজ করার বিষয়টি নীতিতে গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, আমদানি প্রক্রিয়া সহজ হলে ব্যবসার খরচ কমবে এবং প্রতিযোগিতা বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের জন্যও ইতিবাচক হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন আমদানি নীতির খসড়া তৈরির আগে দেশের বিভিন্ন চেম্বার, ব্যবসায়ী সংগঠন ও শিল্প সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতামত নেওয়া হয়েছে। অংশীজনদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা করে নীতির খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের বিষয়টিও বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণে আর প্রায় ১০ মাস সময় বাকি থাকায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতিটি সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিদ্যমান আমদানি নীতি আদেশের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের জুনে। তবে নতুন নীতি জারি না হওয়ায় পুরোনো আমদানি নীতিই এতদিন কার্যকর রয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই নতুন দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় ছিলেন। নতুন খসড়া নীতি সেই অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

খসড়া আমদানি নীতিতে পরিবেশ ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। হাইড্রোলিক হর্ন আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী হর্নের শব্দমাত্রা সর্বোচ্চ ১০০ ডেসিবেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ৭৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দের হর্ন আমদানিও নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে।

নতুন নীতিতে প্রথমবারের মতো পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ইথাইলিন ও প্রোপাইলিন আমদানির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের অনুমতি নেওয়ার শর্ত রাখা হয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ পেট্রোকেমিক্যাল খাতের বিকাশে সহায়ক হতে পারে।

খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, আমদানি নিষিদ্ধ রাসায়নিক মিথাইল ব্রোমাইডের কারণে অস্ট্রেলিয়ায় চাল ও মসলা রপ্তানিতে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর পাশাপাশি গ্যাস সিলিন্ডার আমদানিতে আলাদা এইচএস কোড নির্ধারণ, পরিবেশবান্ধবভাবে ব্যাটারি রিসাইক্লিং নিশ্চিত করে পুরোনো ব্যাটারি আমদানির সুযোগ এবং পাম অলিন আমদানিতে বিএসটিআইয়ের মান সনদের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

খসড়া নীতিতে সব ধরনের বর্জ্য পদার্থ আমদানি নিষিদ্ধ করার কথাও উল্লেখ রয়েছে। নিষিদ্ধ তালিকায় চিংড়ি, জীবিত শূকর ও শূকরজাত পণ্য, পপি বীজ, পোস্তদানা, ঘাস, ঘন চিনি, কৃত্রিম সরষের তেল, রিকন্ডিশন্ড অফিস ইকুইপমেন্ট, পুরোনো কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক, পলিথিন ও পলিপ্রোপাইলিন ব্যাগ এবং দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনের থ্রি-হুইলার যানবাহন আমদানিও নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে।

অন্যদিকে শর্তসাপেক্ষে আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি, তিন বছরের বেশি পুরোনো ও ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেল, সাড়ে চার সেন্টিমিটারের কম ব্যাসের কারেন্ট জাল এবং এলএনজি। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকদের মতে, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানের মতো দেশেও গাড়ির বয়সসীমা শিথিল রয়েছে, ফলে সাধারণ মানুষ তুলনামূলক কম দামে গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পায়। বাংলাদেশেও এই নীতি কার্যকর হলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য গাড়ি কেনা কিছুটা সহজ হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

সামগ্রিকভাবে নতুন আমদানি নীতির খসড়া দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, অন্যদিকে পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা রক্ষার ভারসাম্য—এই দুইয়ের সমন্বয়ই নীতির মূল লক্ষ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের পর চূড়ান্ত নীতি কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেদিকেই নজর থাকবে ব্যবসায়ী মহল ও সাধারণ মানুষের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত