এডিপি কমছে ৩০ হাজার কোটি টাকা, ব্যয়ের লাগাম টানছে সরকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭১ বার
এডিপির বরাদ্দ কমছে ৩০ হাজার কোটি টাকা

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, রাজস্ব আহরণে চ্যালেঞ্জ এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠক শেষে সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি সংশোধিত এডিপির এই চিত্র তুলে ধরেন।

ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রণীত মূল এডিপির আকার ছিল প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি মূল্যায়ন করে সরকার সেটি সংশোধন করেছে। সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) মোট আকার এখন ২ লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মূল এডিপির তুলনায় মোট বরাদ্দ ৩০ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে।

পরিকল্পনা উপদেষ্টার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই হ্রাসের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়নে ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নে ১৪ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। সংশোধিত এডিপিতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়নের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ৭২ হাজার কোটি টাকা। তিনি বলেন, বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তার ক্ষেত্রে বাস্তব ছাড়ের গতি প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় এই সমন্বয় করা হয়েছে।

এনইসি বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, এডিপির বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্ত হঠাৎ নয়। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে প্রকল্প বাস্তবায়নের হার তুলনামূলকভাবে কম থাকায় এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকার চায় না যে কাগজে-কলমে বড় এডিপি থাকুক, অথচ বাস্তবায়নে তা পিছিয়ে পড়ুক। বরং বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছে নীতি নির্ধারকেরা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ প্রকল্প গ্রহণে অতিরিক্ত আশাবাদী প্রাক্কলন করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে ভূমি অধিগ্রহণ, দরপত্র প্রক্রিয়া, বৈদেশিক অর্থ ছাড় এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয় না। ফলে বছরের শেষে বড় অঙ্কের বরাদ্দ অব্যয়িত থেকে যায়। সংশোধিত এডিপিতে এই অকার্যকর প্রবণতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, সরকার উন্নয়ন ব্যয় কমাচ্ছে না, বরং অগ্রাধিকার নির্ধারণ করছে। তিনি জানান, সংশোধিত এডিপিতে চলমান ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। যেসব প্রকল্পে বাস্তবায়ন অগ্রগতি ধীর অথবা যেগুলোর গুরুত্ব তুলনামূলক কম, সেগুলোতেই মূলত বরাদ্দ ছাঁটাই করা হয়েছে।

এডিপির আওতায় থাকা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেশনগুলোর জন্যও সংশোধিত বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা জানান, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বা কর্পোরেশনের আরএডিপির আকার ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়ন ৮ হাজার ৯৩০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে মাত্র ৫ কোটি টাকা। এই খাতে বৈদেশিক অর্থায়ন প্রায় নেই বললেই চলে, যা দেশের নিজস্ব সক্ষমতার ওপর নির্ভরতার ইঙ্গিত দেয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এডিপির আকার কমানো সরকারের আর্থিক বাস্তবতাকে স্বীকার করারই প্রতিফলন। বৈশ্বিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট এবং রাজস্ব আদায়ে চাপের মধ্যে বড় আকারের উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সংশোধিত এডিপি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের একাংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এডিপি কমানোর ফলে কিছু খাতে উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি শ্লথ হতে পারে। বিশেষ করে অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নতুন প্রকল্প গ্রহণের সুযোগ সীমিত হতে পারে বলে তারা মনে করছেন। যদিও সরকার বলছে, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতগুলোতে বরাদ্দ সুরক্ষিত রাখা হয়েছে।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা আরও বলেন, সরকার এখন ‘গুণগত উন্নয়ন’-এর দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। বড় অঙ্কের প্রকল্প নিলেও সেগুলো সময়মতো শেষ না হলে তার সুফল পাওয়া যায় না। তাই কম কিন্তু কার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়নের কৌশল নেওয়া হচ্ছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সংশোধিত এডিপির আওতায় যে প্রকল্পগুলো রাখা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

এনইসি বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরের এডিপি প্রণয়নের ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হবে। প্রকল্প প্রস্তাব যাচাইয়ে আরও কঠোরতা আরোপ করা হবে এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়েই বরাদ্দ দেওয়া হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন ব্যয়ের দক্ষতা বাড়বে বলে মনে করছেন নীতি নির্ধারকেরা।

সংশোধিত এডিপি অনুমোদনের মধ্য দিয়ে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ব্যবস্থাপনায় নতুন এক বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সরকার যে ভারসাম্যপূর্ণ পথ বেছে নিয়েছে, তা কতটা সফল হয়—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত