‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেউ নয়’—মার্কিন রাষ্ট্রদূত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৭ বার
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের গুরুত্ব

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনশীল সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্র–ভারত সম্পর্ক যে ক্রমেই আরও গভীর ও কৌশলগত রূপ নিচ্ছে, তারই জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছেন ভারতের নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ভারতের মতো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আর কোনো দেশ এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। একইসঙ্গে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লি আগামী মঙ্গলবার থেকে তাদের পরবর্তী দফার বাণিজ্য চুক্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করতে যাচ্ছে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

দিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসে এক বিশেষ বক্তৃতায় সার্জিও গোর এই মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যে কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে ভারতের অবস্থান নিয়ে এক ধরনের স্পষ্ট ও আত্মবিশ্বাসী বার্তাই ফুটে ওঠে। গোর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক এখন আর কেবল আঞ্চলিক বা দ্বিপাক্ষিক সীমায় আবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক কৌশলগত অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত আরও জানান, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আগামী বছরের মধ্যেই ভারত সফর করতে পারেন। যদিও সফরের নির্দিষ্ট সময়সূচি বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও আসেনি, তবে এমন সম্ভাবনার কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরায় আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সম্ভাব্য ভারত সফর হলে তা শুধু কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বরং বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণেও তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

সার্জিও গোর তার বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, এই সম্পর্ক কোনো কৃত্রিম কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার ফল নয়, বরং এটি একটি ‘আসল’ বন্ধুত্ব। তার ভাষায়, “প্রকৃত বন্ধুরা একে অপরের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতেই পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সেই মতপার্থক্যের সমাধান খুঁজে বের করে। ট্রাম্প ও মোদির সম্পর্ক ঠিক তেমনই।”

গোর আরও বলেন, তিনি নিজে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সফর করেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি দৃঢ়ভাবে বলতে পারেন, প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে ট্রাম্পের বন্ধুত্ব খাঁটি ও আন্তরিক। এই ব্যক্তিগত বোঝাপড়াই দুই দেশের মধ্যে জটিল ইস্যুগুলো সমাধানে সহায়ক হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাণিজ্য প্রসঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানান, ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। আগামী মঙ্গলবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এই আলোচনা দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বাণিজ্য ইস্যুগুলো সমাধানের সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। শুল্ক, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল—এসব বিষয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে।

তবে গোর স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র–ভারত সম্পর্ক কেবল বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি উল্লেখ করেন, নিরাপত্তা সহযোগিতা, সন্ত্রাসবাদ দমন, জ্বালানি নিরাপত্তা, আধুনিক প্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও দুই দেশ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। তার মতে, এই বহুমাত্রিক সহযোগিতাই যুক্তরাষ্ট্র–ভারত সম্পর্ককে অন্য যেকোনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের তুলনায় আলাদা ও শক্তিশালী করেছে।

গোর বলেন, “আমাদের সম্পর্ক কেবল অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি, বরং এটি সর্বোচ্চ রাজনৈতিক স্তরে প্রতিষ্ঠিত এক ধরনের আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।” এই আস্থাই দুই দেশকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে এগিয়ে নিতে সাহায্য করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে গোর বলেন, আগামী মাস ও বছরগুলোতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে তার লক্ষ্য হবে একটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এজেন্ডা অনুসরণ করা। তিনি জানান, এই এজেন্ডার মূল উদ্দেশ্য হলো দুই দেশকে প্রকৃত কৌশলগত অংশীদার হিসেবে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। তার ভাষায়, “আমরা প্রত্যেকে শক্তি, সম্মান ও নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনার টেবিলে আসব।”

বিশ্লেষকদের মতে, গোরের এই বক্তব্য শুধু কূটনৈতিক প্রশংসা নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলেরও প্রতিফলন। চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্গঠন—এসব ইস্যুতে ভারতের ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়াই এখন ওয়াশিংটনের কৌশলগত বাস্তবতা।

ভারতের দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার প্রবণতা স্পষ্ট। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা, যৌথ সামরিক মহড়া, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কোয়াড জোটের মতো উদ্যোগে ভারতের সক্রিয় অংশগ্রহণ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। গোরের বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাণিজ্য চুক্তি আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়া এবং ট্রাম্পের সম্ভাব্য ভারত সফরের ঘোষণা একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র–ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, দুই দেশ কেবল বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক নেতৃত্বের লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করতে চায়।

সব মিলিয়ে সার্জিও গোরের মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র–ভারত সম্পর্কের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। এই বার্তা শুধু নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া ও বৈশ্বিক রাজনীতিতেও এর প্রতিধ্বনি শোনা যাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত