লাতিন আমেরিকা কেন ট্রাম্পের কৌশলগত টার্গেট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১১৭ বার
লাতিন আমেরিকা ট্রাম্প টার্গেট কেন

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এক সময় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী এই পরাশক্তি এখন চীন, রাশিয়া ও ভারতের মতো উদীয়মান শক্তির উত্থানে ক্রমশ চাপে পড়ছে। বিশেষ করে জো বাইডেন প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব ও কূটনৈতিক দাপট যে মাত্রায় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, তা ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এই বাস্তবতায় ক্ষমতায় ফিরে আসা ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বহুল আলোচিত ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ বা ‘মাগা’ কর্মসূচিকে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির স্লোগান হিসেবেই নয়, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামো পুনর্গঠনের একটি আক্রমণাত্মক কৌশল হিসেবে প্রয়োগ করতে চাইছেন।

এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লাতিন আমেরিকা। ভৌগোলিক নৈকট্য, বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন অঞ্চল হওয়ায় এই অঞ্চলকে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরীক্ষাগার হিসেবে বেছে নিয়েছে। ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন আগ্রাসনকে তাই একক কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি দীর্ঘদিনের সাম্রাজ্যবাদী নীতির ধারাবাহিকতায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বলপ্রয়োগ, হুমকি এবং পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি। কূটনৈতিক আলোচনার পরিবর্তে চাপ প্রয়োগ, অর্থনৈতিক অবরোধ, তথ্যযুদ্ধ এবং প্রয়োজনে সামরিক হস্তক্ষেপের পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে। এই নীতির প্রথম শিকার হিসেবে সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বা স্বায়ত্তশাসিত অবস্থান নেওয়া লাতিন আমেরিকার দেশগুলো। ভেনেজুয়েলা তার প্রতীকী উদাহরণ, যেখানে বিপুল তেলসম্পদ এবং সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের অস্বস্তির কারণ।

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপ শুধু একটি সরকারের বিরুদ্ধে অভিযান নয়; এটি পুরো অঞ্চলের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। কারণ ইতিহাস বলে, যুক্তরাষ্ট্র যখনই এই অঞ্চলে ‘গণতন্ত্র রক্ষা’ বা ‘নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ’-এর নামে হস্তক্ষেপ করেছে, তার ফল হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা ও মানবিক বিপর্যয়। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার উৎখাত থেকে শুরু করে ১৯৭৩ সালে চিলিতে অগাস্টো পিনোশের রক্তক্ষয়ী সামরিক শাসনের উত্থান—সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছে। গ্রেনাডা, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও মধ্য আমেরিকার বহু দেশে সামরিক সরকারকে প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের ইতিহাস আজও লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক স্মৃতিতে তাজা।

এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কারণেই ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা সমগ্র অঞ্চলে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যদি ওয়াশিংটন সহজেই কারাকাসে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারে, তাহলে কলম্বিয়া, কিউবা, মেক্সিকো বা অন্য কোনো দেশ যে নিরাপদ থাকবে—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইতোমধ্যেই কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রোর সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব এবং ‘পরবর্তী টার্গেট’ হওয়ার হুমকি এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন যে বয়ান তৈরি করছে, তা মূলত ‘মাদক পাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এবং ‘গণতন্ত্র রক্ষা’র নামে আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এই বয়ানের আড়ালে লুকিয়ে আছে অর্থনৈতিক ও ভূকৌশলগত স্বার্থ। লাতিন আমেরিকা তেল, গ্যাস, সোনা, তামা ও লিথিয়ামের মতো কৌশলগত সম্পদে সমৃদ্ধ। বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য যখন দ্রুত বদলাচ্ছে, তখন এসব সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্রমেই জরুরি হয়ে উঠছে।

ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলভান্ডার, ওরিনোকো মাইনিং আর্কের খনিজসম্পদ এবং আমাজন অঞ্চলের জলসম্পদ ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, বরং বৈশ্বিক প্রভাব ধরে রাখার অস্ত্র। একইভাবে গায়ানা, যেটি বর্তমানে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে আঞ্চলিক বিরোধে জড়িত, তাকেও ওয়াশিংটন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। এসব দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা মানে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক করিডোর সুসংহত করা।

এই প্রেক্ষাপটে কলম্বিয়ার ভূমিকা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ‘প্ল্যান কলম্বিয়া’ কর্মসূচির মাধ্যমে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামোর ভেতরে বেঁধে রেখেছে। মাদকবিরোধী সহযোগিতার আড়ালে গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্ক আজ ক্যারিবিয়ান থেকে আমাজন পর্যন্ত বিস্তৃত একটি প্রভাববলয় তৈরি করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের অংশ।

ব্রাজিলসহ অন্যান্য দেশেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ‘মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই’ কিংবা ‘মানবাধিকার রক্ষা’র মতো উচ্চকিত বক্তব্য ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ বিভাজন উসকে দেওয়া, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করা এবং শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপের পথ সুগম করাই এই কৌশলের মূল লক্ষ্য। যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত সরকারগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের স্বার্থ রক্ষা করছে, ততক্ষণ তারা নিরাপদ থাকলেও যে দেশগুলো স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চায়, তাদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

এই আক্রমণাত্মক নীতির ফল হিসেবে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। আঞ্চলিক জোট, ব্রিকস, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ অংশীদারিত্ব নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের পর এসব উদ্যোগ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন মূলত এই প্রবণতাকেই থামাতে চায় এবং সেই লক্ষ্যেই লাতিন আমেরিকার চীন-রাশিয়া ঘনিষ্ঠ সরকারগুলোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, লাতিন আমেরিকা আজ শুধু একটি অঞ্চল নয়; এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান মঞ্চ। ট্রাম্পের ‘মাগা’ কৌশলে এই অঞ্চলকে টার্গেট করার অর্থ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী নীতির নতুন রূপ। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে, এই পথ শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য শুভ নয়। তবে পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় লাতিন আমেরিকার দেশগুলো কীভাবে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ রক্ষা করবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com