কবরে থেকেও সালামের জবাব দেন মহানবী (সা.)

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৯ বার
কবরে থেকেও সালামের জবাব দেন মহানবী (সা.)

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাম পেশ করা ইসলামের একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ আমল। এটি কেবল মুখে উচ্চারিত কিছু শব্দ নয়; বরং এটি একজন মুমিনের অন্তরের ভালোবাসা, সম্মান, আনুগত্য ও আত্মিক সংযোগের বহিঃপ্রকাশ। যুগে যুগে মুসলমানরা তাদের নবীর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠের মাধ্যমে নিজেদের ঈমানকে নবীপ্রেমে সিক্ত করেছেন। কোরআন ও সহিহ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সালাম পাঠের ফজিলত, মর্যাদা ও তাৎপর্য এতটাই গুরুত্বসহকারে বর্ণিত হয়েছে যে, এটি মুসলিম জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।

মুসলমানদের মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন জাগে—মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, তাহলে আমাদের পাঠানো সালাম কি তাঁর কাছে পৌঁছায়? তিনি কি তা উপলব্ধি করেন? সহিহ হাদিসের আলোকে এর উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট ও হৃদয়স্পর্শী। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই এ বিষয়ে উম্মতকে আশ্বস্ত করেছেন।

আবূ হুরাইরাহ (রা.) সূত্রে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ:
مَا مِنْ أَحَدٍ يُسَلِّمُ عَلَيَّ إِلَّا رَدَّ اللَّهُ عَلَيَّ رُوحِي حَتَّى أَرُدَّ عَلَيْهِ السَّلَامَ

অর্থাৎ, “কেউ আমার ওপর সালাম পেশ করলে আল্লাহ আমার রূহ ফিরিয়ে দেন, যাতে আমি তার সালামের জবাব দিতে পারি।”
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২০৪১)

এই হাদিস মুসলমানদের ঈমানি জীবনে এক অনন্য আশার আলো জ্বালিয়ে দেয়। এখান থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতের সালামের ব্যাপারে অবগত থাকেন এবং আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সেই সালামের জবাব প্রদান করেন। এটি কোনো সাধারণ পার্থিব জীবনের ধারাবাহিকতা নয়, বরং নবীদের জন্য নির্ধারিত এক বিশেষ বরযখি জীবন, যা সাধারণ মানুষের মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের সঙ্গে তুলনীয় নয়।

ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, নবী-রাসুলগণ কবরে সাধারণ মানুষের মতো নন। তাঁরা এক বিশেষ জীবন লাভ করেন, যাকে আলেমরা “হায়াতুল আম্বিয়া” বা নবীদের বিশেষ জীবন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই জীবনে তাঁরা ইবাদতে মশগুল থাকেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় উম্মতের সঙ্গে এক আত্মিক সম্পর্ক বজায় রাখেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সালাম পৌঁছানো এবং তাঁর পক্ষ থেকে সালামের জবাব পাওয়া এই বিশেষ জীবনেরই অংশ।

এই হাদিসের আলোকে আলেমরা বলেন, মদিনায় গিয়ে রওজা শরিফের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দেওয়া যেমন ফজিলতপূর্ণ, তেমনি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠানো সালামও মহানবী (সা.)-এর কাছে পৌঁছে যায়। সময় ও স্থানের কোনো সীমাবদ্ধতা এতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। কারণ এটি আল্লাহর কুদরতের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি বিষয়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাম পাঠের গুরুত্ব কোরআন মাজিদেও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর ওপর দরূদ পাঠ করেন। হে মুমিনগণ, তোমরাও তাঁর ওপর দরূদ ও সালাম পাঠ কর।” এই আয়াত মুসলমানদের জন্য এক সুস্পষ্ট নির্দেশনা—নবীপ্রেম কেবল মুখে দাবি করার বিষয় নয়; বরং দরূদ ও সালামের মাধ্যমে তা নিয়মিতভাবে প্রকাশ করতে হবে।

ইতিহাসে দেখা যায়, সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সালাম পাঠের বিষয়ে ছিলেন অত্যন্ত যত্নশীল। তাঁরা নবীর নাম উচ্চারণের সময় কণ্ঠ নত করতেন, হৃদয় ভরে দরূদ পাঠ করতেন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর সুন্নাহ অনুসরণে সচেষ্ট থাকতেন। তাঁদের এই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পরবর্তী প্রজন্মের মুসলমানদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

এই হাদিসের একটি গভীর মানবিক দিকও রয়েছে। একজন উম্মত যখন দূর কোনো দেশে বসে তার প্রিয় নবীর প্রতি সালাম পাঠ করে, তখন তার মনে এক ধরনের সান্ত্বনা, প্রশান্তি ও আত্মিক সংযোগ তৈরি হয়। সে অনুভব করে—আমি একা নই, আমার সালাম আমার নবীর কাছে পৌঁছাচ্ছে, আর তিনি আমার জন্য জবাব দিচ্ছেন। এই বিশ্বাস মুমিনের হৃদয়কে দৃঢ় করে, ঈমানকে শক্তিশালী করে এবং নৈতিক জীবন গঠনে সহায়তা করে।

আধুনিক ব্যস্ত জীবনে অনেক সময় মানুষ ইবাদতে মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু দরূদ ও সালাম এমন একটি আমল, যা অল্প সময়েই করা যায় এবং যার সওয়াব অপরিসীম। চলতে ফিরতে, কাজের ফাঁকে, নামাজের পরে কিংবা নিভৃতে বসে—যেকোনো সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ করা যায়। এটি শুধু সওয়াবের কারণই নয়, বরং হৃদয়ে প্রশান্তি ও মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে।

আলেমদের মতে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরূদ ও সালাম পাঠ করলে দুনিয়া ও আখিরাতের বহু কল্যাণ লাভ হয়। দুশ্চিন্তা দূর হয়, অন্তর প্রশস্ত হয় এবং আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। সবচেয়ে বড় কথা, কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নৈকট্য লাভের এক বিশেষ মাধ্যম হলো দরূদ ও সালাম।

এই হাদিস আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—নবীপ্রেম কখনো কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠের পাশাপাশি তাঁর আদর্শ, চরিত্র ও সুন্নাহ বাস্তব জীবনে অনুসরণ করাই প্রকৃত ভালোবাসার প্রমাণ। অন্যায় থেকে বিরত থাকা, সত্যবাদিতা, দয়া, সহনশীলতা ও মানবতার যে শিক্ষা রাসুলুল্লাহ (সা.) দিয়ে গেছেন, তা ধারণ করাই একজন মুমিনের মূল দায়িত্ব।

আজকের অস্থির ও অনিশ্চিত বিশ্বে মানুষ যখন দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাম ও দরূদ পাঠ এক ধরনের আশ্রয় হয়ে ওঠে। এটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—এই জীবনের সব সংকটের মাঝেও একজন নবী আছেন, যিনি তাঁর উম্মতের কথা ভুলে যান না, বরং আল্লাহর ইচ্ছায় তাদের সালামের জবাব দেন।

পরিশেষে বলা যায়, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাম পাঠ কেবল একটি ইবাদত নয়, এটি ঈমানের পরিচয়, ভালোবাসার প্রকাশ এবং আত্মিক শান্তির উৎস। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর প্রিয় নবীর প্রতি বেশি বেশি দরূদ ও সালাম পাঠ করার তাওফিক দান করেন এবং সেই আমলের বরকতে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান করেন—এই কামনাই প্রতিটি মুমিনের অন্তরের দোয়া।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত