প্রাথমিক শিক্ষায় ধাপে ধাপে দায়িত্ব জিআরআর মডেল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪০ বার
প্রাথমিক শিক্ষায় ধাপে ধাপে দায়িত্ব জিআরআর মডেল

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আসছে নতুন ধারা। সরকার শুরু করতে যাচ্ছে জিআরআর (গ্র্যাজুয়াল রিলিজ অব রেসপনসিবিলিটি) মডেল, যা শিক্ষার্থীদের দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা প্রদানের পথে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার লক্ষ্য রাখছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক স্তরে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। ফলে শিশুরা সাধারণত তথ্য মনে রাখতে পারলেও তা বাস্তবে প্রয়োগ বা সমস্যার সমাধানে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না। নতুন এই জিআরআর মডেল শিক্ষার্থীকে শিক্ষার মূল নিয়ন্ত্রণে এনে তাকে স্বনির্ভর, সক্রিয় এবং সমস্যা সমাধান দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ।

শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, জিআরআর মূলত একটি শিক্ষণ ও মূল্যায়ন কাঠামো, যেখানে শিক্ষক প্রথমে শিক্ষার্থীর কাছে শেখানোর দায়িত্ব পালন করেন, ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর ওপর এই দায়িত্ব ছাড়েন এবং শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী স্বাধীনভাবে শেখার সক্ষম হয়ে ওঠে। এই পদ্ধতি ‘আমি করি, আমরা করি, তুমি একা করো’ নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। এটি শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা এবং সমস্যার সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

জিআরআর মডেলটি বাস্তবায়নের ধাপগুলো চারটি পর্যায়ে বিভক্ত। প্রথম ধাপে শিক্ষক নিজে করে দেখান, যা শিক্ষার্থীর কাছে মডেলিং হিসেবে কাজ করে। দ্বিতীয় ধাপে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী একসঙ্গে অনুশীলন করেন। এই পর্যায়ে শিক্ষার্থী শিক্ষকের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ শিখে নেয় এবং তার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। তৃতীয় ধাপে শিক্ষার্থীরা জুটিতে বা সহপাঠীদের সঙ্গে সহযোগিতা করে শেখে। এখানে তাদের মধ্যে পারস্পরিক শেখার পরিবেশ তৈরি হয়, যা সহযোগিতা ও যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ায়। শেষ ধাপে শিক্ষার্থী কোনো সহায়তা ছাড়াই নিজে নিজে শেখা শুরু করে। এভাবে শিক্ষার্থী পূর্ণভাবে স্বনির্ভর হয়ে ওঠে, যেখানে শিক্ষক কেবল পর্যবেক্ষক ও পরামর্শদাতা হিসেবে থাকেন।

সরকারের শিক্ষাবিদরা বলছেন, জিআরআর মডেল শুধু শিক্ষার্থীর শিখন ক্ষমতা নয়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ককেও আরও কার্যকর করবে। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবিষয় শিক্ষা না দিয়ে শিক্ষার্থীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দিচ্ছেন, যা শিশুদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বিকাশে সহায়ক। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা আত্মনির্ভর হয়ে ওঠায় তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও শৃঙ্খলাবোধও বৃদ্ধি পায়।

এই মডেলের আরেকটি সুবিধা হলো মূল্যায়নের ক্ষেত্রে। পূর্বের মুখস্থনির্ভর পরীক্ষায় শিক্ষার্থীর রেটিং বা ফলাফল শুধুই তথ্য মনে রাখার ওপর নির্ভরশীল হতো। জিআরআর মডেলে শিক্ষার্থীর প্রকৃত দক্ষতা, সমাধান করার ক্ষমতা, সহযোগিতা ও বাস্তব প্রয়োগের সক্ষমতা মূল্যায়িত হয়। ফলে শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত অগ্রগতি বেশি নির্ভুলভাবে দেখা যায়।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পাঠ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সরকারের নীতিনির্ধারকরা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন শুরু করেছেন। নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষককে কেবল পাঠ্য বিষয় শেখানোর দায়িত্বই নয়, শিক্ষার্থীর শেখার প্রক্রিয়ায় সহায়তা, পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনমতো সহায়তা দেওয়া শেখানো হচ্ছে। এদিকে অভিভাবকদেরও সচেতন করা হচ্ছে, যাতে ঘরে শিশুরা নিজের মতো করে শেখার সুযোগ পায় এবং শুধু মুখস্থ করা নয়, বোঝার ভিত্তিতে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক স্তরে এই মডেল চালু হলে শিশুদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে। তারা শিক্ষক নির্ভর নয়, নিজের ওপর নির্ভর করে শেখার অভ্যাস গড়ে তুলবে। এতে ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে শিশুরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে সক্ষম হবে এবং সৃজনশীল সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন করবে।

জিআরআর মডেলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শুধু জ্ঞান অর্জনই করবে না, বরং তা প্রয়োগের যোগ্য হবে। শিক্ষার্থীর মধ্যে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, সহযোগিতা, এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এই পরিবর্তন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দেশে বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে মানসম্মত শিক্ষার আওতায় আনার জন্য আধুনিক ও কার্যকর শিক্ষণ পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। জিআরআর মডেল সেই অভাব পূরণের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হচ্ছে।

সবমিলিয়ে, বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন জিআরআর মডেল চালু হওয়া শিক্ষাব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। এটি শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং স্বনির্ভরতার ওপর জোর দেবে, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক আরও কার্যকর করবে, এবং শিক্ষার প্রকৃত মান বাড়াবে। এই ধাপিক পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন দিগন্তের দিকে এগোচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত