আধুনিক অ্যাপে সহজ হলো মেট্রোরেলের রিচার্জ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৭ বার
আধুনিক অ্যাপে সহজ হলো মেট্রোরেলের রিচার্জ

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার ব্যস্ততম রুটগুলোতে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন হিসেবে অবশেষে চালু হয়েছে মেট্রোরেল ‘র‌্যাপিড পাস’ রিচার্জের মোবাইল অ্যাপ সেবা, যা যাত্রীদের জন্য ডিজিটাল যুগের এক সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ সমাধান হিসেবে ধরা দিয়েছে। শুধু মেট্রোরেলই নয়, এই নতুন সেবা প্রতিষ্ঠানটিকে আরও বহু বাধা-চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে রুদ্ধদ্বার থেকে মুক্ত করেছে। সরকারি কর্মকর্তারা মনে করেন, শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধা দেয়া হয়নি, বরং যাত্রীদের জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, যেখানে ঘরে বসেই একটি স্মার্ট কার্ড রিচার্জ করা সম্ভব হবে এবং এর ফলে স্টেশনের কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন দাঁড়িয়ে কাটাতে হবে না।

এই আধুনিক সেবার উদ্বোধন অনুষ্ঠান গত সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ডিটিসিএ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন, ডিটিসিএ-এর নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. মো. মশিউর রহমান, এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে সাবেক নির্বাহী পরিচালক নীলিমা আখতার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা নতুন অ্যাপ সেবার সুবিধা, এর প্রয়োজনীয়তা, এবং ভবিষ্যতে এটি কীভাবে দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় Game Changer ভূমিকা রাখবে, সে সম্পর্কিত বিস্তৃত দিকগুলো তুলে ধরেন।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) জানায়, এই মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রীরা খুব সহজেই তাদের ‘র‌্যাপিড পাস’ বা স্মার্ট কার্ড রিচার্জ করতে পারবেন। এর জন্য আর প্রয়োজন নেই লাইনে দাঁড়িয়ে ঘন্টাখানেক সময় ঝুড়িয়ে দিতে। আধুনিক ডিজিটাল পেমেন্ট সহজেই সম্পন্ন করে যাত্রী দ্রুত তাদের কার্ডে ব্যালেন্স যোগ করতে পারবেন। অ্যাপটি গুগল প্লে স্টোরে অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের জন্য ইতোমধ্যেই উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং iOS ভার্সনও শীঘ্রই বাজারে আসবে বলে জানানো হয়েছে।

অ্যাপ ব্যবহারের প্রাথমিক ধাপগুলো অত্যন্ত সোজা ও ব্যবহারবান্ধব করা হয়েছে। প্রথমত, ব্যবহারকারীকে গুগল প্লে স্টোর থেকে নির্দিষ্ট অ্যাপটি ডাউনলোড করতে হবে এবং একবার সাইন-আপ বা নিবন্ধন করতে হবে। যে কর্মীরা পূর্বে ‘র‌্যাপিড পাস’ ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করেছিলেন, তাঁরা সেই একই লগইন তথ্য ব্যবহার করে সহজেই অ্যাপে প্রবেশ করতে পারবেন। একবার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করলে, ব্যবহারকারীর কার্ডটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেখা যাবে এবং প্রয়োজনে নতুন ‘র‌্যাপিড পাস’ বা MRT কার্ড যুক্ত করার অপশনও বিদ্যমান রয়েছে।

অ্যাপের অন্যতম অগ্রগণ্য ফিচার হলো বিভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে রিচার্জ করা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে দেশের পরিচিত নেটওয়ার্কগুলো যেমন বিকাশ, রকেট, ভিসা, মাস্টারকার্ড এবং এএমইএক্স কার্ড। এতে করে দেশজুড়ে যাত্রীরা তাদের স্বস্তি ও সুবিধা মত পেমেন্ট মাধ্যম নির্বাচন করে রিচার্জ সম্পন্ন করতে পারবেন। অনলাইনে সর্বনিম্ন ১০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত যেকোনো পরিমাণে রিচার্জ করা সম্ভব। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, অনলাইনে পেমেন্ট সম্পন্ন করলেই টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্ডে যোগ হবে না; পেমেন্ট শেষ হওয়ার পর যাত্রীকে স্টেশনের ‘অ্যাড ভ্যালু মেশিন’ (AVM)-এ তাদের কার্ডটি একবার ট্যাপ করতে হবে, তখনই রিচার্জ করা টাকা কার্যকর হবে। সফল রিচার্জের পর সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারকারীর মোবাইলে একটি নিশ্চিতকরণ মেসেজ পাঠিয়ে দেয়া হবে, যা যাত্রীর নিশ্চিততা বাড়াবে।

ডিটিসিএ-এর কর্মকর্তারা জানান, এই অ্যাপটি শুধু রিচার্জের কাজকেই সহজ করেনি; বরং এটি যাত্রীদের জন্য নানা উন্নত সুবিধা উপস্থাপন করেছে। যেমন, যারা NFC সমর্থিত স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, তারা খুব সহজেই ফোনের মাধ্যমে কার্ডের ব্যালেন্স তাৎক্ষণিকভাবে চেক করতে পারবেন। এর ফলে আর স্টেশনে গিয়ে AVM মেশিন ব্যবহার না করেও যাত্রী তাদের ব্যালেন্স সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে পারবেন। এছাড়া অ্যাপটি রিচার্জের ইতিহাস এবং কার্ড ব্যবহারের বিস্তারিত তথ্য দেখার সুযোগও প্রদান করে, যা যাত্রীদের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

ডিটিসিএ আরো জানায়, অনলাইন রিচার্জের ক্ষেত্রে কিছু শর্তাবলীও প্রযোজ্য। পেন্ডিং অবস্থায় থাকা রিচার্জ বাতিল করতে চাইলে ব্যবহারকারীকে ৭ দিনের মধ্যে আবেদন করতে হবে এবং সেই ক্ষেত্রে ৫% সার্ভিস চার্জ ধার্য করা হবে। একটি কার্ডে একবারে মাত্র একটি পেন্ডিং রিচার্জ রাখা যাবে। এই নিয়মগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে যাত্রীদের আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের ডিজিটাল সেবা গড়ে ওঠা শুধু একটি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, এটি যাত্রী-centric পরিবহন ব্যবস্থার অংশ। বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে বিশেষত ঢাকা, যেখানে প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষ মেট্রোরেল ব্যবহার করেন, এই ডিজিটাল রিচার্জ সুবিধা যাত্রীদের সময়, শ্রম এবং মানসিক চাপ যথাক্রমে কমাবে। এর ফলে যানজট ও স্টেশনে মানুষের ভিড়ও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে, যা শহরের পরিবহন ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ডিটিসিএয়ের কর্মকর্তারা জানান, ভবিষ্যতে এই অ্যাপের মাধ্যমে শুধুমাত্র রিচার্জই নয়, আরও সেবাসমূহ যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে স্মার্ট টিকিট বুকিং, সময়সূচী সতর্কতা, রিয়েল-টাইম ট্রেন অবস্থান তথ্য, এবং অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবস্থার সাথে ইন্টিগ্রেশন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই উন্নত ফিচারগুলো আসলে একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিবহন ইকোসিস্টেমের দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে করা হচ্ছে।

নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত বিবেচনা করলে দেখা যায়, নতুন এই অ্যাপ সেবা চালুর খবর দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে অতিক্রম করেছে। সাধারণ যাত্রীরা জানিয়েছেন যে তারা দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের সুবিধার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বিশেষ করে ব্যস্ত কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও অফিসগামী নাগরিকরা মনে করেন, এই নতুন অ্যাপ সেবার ফলে তাদের দৈনন্দিন যাতায়াত আরও মসৃণ ও সুবিধাজনক হবে। ক্যাব, অটো, বাস ইত্যাদি অন্যান্য পরিবহনের সাথে তুলনায় মেট্রোরেল ভ্রমণ আগেই দ্রুত গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে জনপ্রিয় ছিল; এই নতুন সেবার মাধ্যমে তা আরও প্রাধান্য পাবে বলে মনে করেন তারা।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণ দেশের ই-কমার্স ও অনলাইন সেবার বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখবে। যেখানে নগদ নগদ লেনদেন ধীরে ধীরে কমছে, সেখানে এই ধরনের অ্যাপ যেতে যাচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে।

মেট্রোরেলের ‘র‌্যাপিড পাস’ রিচার্জ অ্যাপের এই ধারাবাহিক উন্নয়ন আবহাওয়া, যানজট, অবকাঠামোগত চাপসহ নগর পরিবহনের অন্যান্য সমস্যা সমাধানের একটি অংশ মাত্র। তবে এটিও নিঃসন্দেহে একটি বড় ধাপ, যা দেশের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনকে আরো গতিশীল করবে এবং যাত্রীদের দৈনন্দিন জীবনে সামগ্রিকভাবে উন্নতি নিয়ে আসবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত