ইসলামে রসিকতা: অনুমোদন, সৌন্দর্য ও সীমারেখা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৮ বার
ইসলামে রসিকতা: অনুমোদন, সৌন্দর্য ও সীমারেখা

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসলামকে অনেক সময় কঠোর ও শুষ্ক জীবনব্যবস্থার ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ কোরআন-হাদিস ও নববী সিরাত গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে স্পষ্ট হয়, ইসলাম মানবজীবনের স্বাভাবিক আনন্দ, হাসি ও রসিকতাকে অস্বীকার করে না। বরং শালীনতা, সত্যনিষ্ঠা ও ভারসাম্যের সীমার মধ্যে থেকে রসিকতা করাকে ইসলাম অনুমোদন দিয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণ এবং তাঁর সাহাবিদের কর্মজীবন এ বিষয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। তিনি যেমন ছিলেন গভীর ভাবগাম্ভীর্য ও দায়িত্ববোধে অনন্য, তেমনি প্রয়োজন অনুযায়ী কোমল হৃদয় ও পরিমিত রসিকতার মাধ্যমেও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। তাঁর রসিকতায় কখনো মিথ্যা, অশালীনতা কিংবা কাউকে আঘাত করার প্রবণতা ছিল না। বরং তাঁর রসিকতা মানুষকে আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাও দিত।

হাদিসের বর্ণনায় এমন বহু ঘটনা পাওয়া যায়, যেখানে রাসুল (সা.) হালকা রসিকতার মাধ্যমে গভীর সত্য তুলে ধরেছেন। একবার এক বৃদ্ধা নারী রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে জান্নাতে প্রবেশের জন্য দোয়া চাইলে তিনি রসিকতার সুরে বলেন, কোনো বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এ কথা শুনে ওই নারী কাঁদতে কাঁদতে চলে যান। পরে রাসুল (সা.) সাহাবিদের বলেন, তাঁকে জানিয়ে দাও, তিনি বৃদ্ধাবস্থায় নয়; বরং আল্লাহ তাঁকে নতুনভাবে সৃষ্টি করে তরুণী অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে রাসুল (সা.) একদিকে যেমন রসিকতা করেছেন, তেমনি জান্নাতের এক গুরুত্বপূর্ণ আকিদাগত সত্যও স্পষ্ট করেছেন।

অন্য একটি ঘটনায় এক সাহাবি রাসুল (সা.)-এর কাছে বাহনের আবেদন করলে তিনি বলেন, তাঁকে একটি উটের বাচ্চা দেওয়া হবে। সাহাবি বিস্মিত হয়ে বলেন, উটের বাচ্চা দিয়ে কী হবে? তখন রাসুল (সা.) বলেন, প্রতিটি উটই তো কোনো না কোনো উটের বাচ্চা। এই রসিকতায় যেমন হাস্যরস আছে, তেমনি সত্যের ব্যতিক্রম নেই।

জাহির (রা.) নামের এক বেদুইন সাহাবির সঙ্গে রাসুল (সা.)-এর রসিকতার ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচিত। জাহির (রা.) শারীরিক সৌন্দর্যে অনগ্রসর হলেও রাসুল (সা.) তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। একদিন বাজারে পেছন থেকে তাঁকে জড়িয়ে ধরে রসিকতার ছলে ‘কে এই দাসকে কিনবে’ বলে ডাক দেন। জাহির (রা.) নিজেকে তুচ্ছ মনে করে বললে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তুমি আল্লাহর কাছে অচল নও।’ এই ঘটনায় রসিকতার পাশাপাশি আত্মমর্যাদা ও আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত মূল্যবোধের শিক্ষা নিহিত রয়েছে।

শুধু রাসুল (সা.) নন, সাহাবায়ে কেরামও পরিমিত রসিকতায় অভ্যস্ত ছিলেন। তাঁদের রসিকতা কখনো দায়িত্বহীনতা বা অসতর্কতার প্রতীক ছিল না। বকর বিন আব্দুল্লাহ আল মুজানি বর্ণনা করেন, সাহাবিরা একে অপরের সঙ্গে রসিকতা করতেন, এমনকি তরমুজ নিক্ষেপ করতেন, কিন্তু বাস্তব ও কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁরা ছিলেন দৃঢ় ও যোগ্য নেতৃত্বের প্রতীক। এ থেকে বোঝা যায়, রসিকতা ইসলামে দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং সুস্থ মানসিকতার প্রকাশ।

হজরত আলী (রা.) ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর বাণীতেও অন্তরের প্রশান্তি ও বিনোদনের প্রয়োজনীয়তার কথা এসেছে। তাঁরা বলেছেন, মানুষের অন্তঃকরণও ক্লান্ত হয়, আর অতিরিক্ত চাপ ও একঘেয়েমি হৃদয়কে অন্ধ করে দিতে পারে। তাই সীমার মধ্যে থেকে চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করা জরুরি।

তবে ইসলাম যেহেতু একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, তাই রসিকতা ও বিনোদনের ক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে। ইসলাম কখনো সীমাহীন হাস্যরস বা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণকে উৎসাহিত করে না। রাসুল (সা.) নিজেই বলেছেন, তিনি রসিকতা করলেও কখনো সত্যের বাইরে যাননি। মিথ্যা বলে মানুষকে হাসানো সম্পর্কে তিনি কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন এবং একে ধ্বংসের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

অতিরিক্ত হাসাহাসি ও অনিয়ন্ত্রিত রসিকতা অন্তরের কঠোরতা ডেকে আনে বলেও হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। তাই ইসলাম স্বল্পমাত্রায়, পরিস্থিতি ও মানুষের রুচিবোধ বিবেচনায় রসিকতার অনুমতি দেয়। এমন রসিকতা, যা কারো সম্মানহানি করে না, গিবত বা উপহাসের মধ্যে পড়ে না এবং শরিয়তের কোনো বিধানকে তুচ্ছ করে না।

বিশেষজ্ঞ আলেমরা বলেন, শরিয়তের বিধান, দ্বীনি প্রতীক কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে উপহাস করা মারাত্মক অপরাধ, যা ঈমানের জন্য হুমকিস্বরূপ। একইভাবে অশ্লীলতা, ভয় দেখানো কিংবা শিশুদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এমন রসিকতাও ইসলাম অনুমোদন করে না।

আধুনিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা, কটূক্তিমূলক ও অশালীন কৌতুক ছড়িয়ে পড়ছে, যা ইসলামের রসিকতার আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে রসিকতা হওয়া উচিত হৃদয় প্রশান্তির মাধ্যম, সম্পর্ক দৃঢ় করার উপায় এবং মানবিক সৌন্দর্যের প্রকাশ।

সবশেষে বলা যায়, ইসলাম হাসি ও আনন্দের বিরোধী নয়। বরং সত্য, শালীনতা ও দায়িত্ববোধের আলোকে রসিকতা ইসলামের সৌন্দর্যকেই ফুটিয়ে তোলে। নবীজি (সা.) ও সাহাবিদের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে আজকের মুসলমান সমাজ যদি রসিকতার সীমা ও আদর্শ অনুসরণ করে, তবে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই হবে সুস্থ, সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত