সুন্দরবনে পাচার ঠেকাতে অভিযান, ১০০ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার
সুন্দরবনে পাচার ঠেকাতে অভিযান, ১০০ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে আবারও বন্যপ্রাণী পাচারের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে মাংস পাচারের সময় বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম ও হরিণের মাংস উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন। এ ঘটনায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চলমান চ্যালেঞ্জ এবং সংঘবদ্ধ পাচারচক্রের তৎপরতা নতুন করে সামনে এসেছে।

কোস্ট গার্ড সূত্র জানায়, সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় সুন্দরবনের কাগাদোবেকি এলাকার ঘোলের খাল সংলগ্ন বনাঞ্চলে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে কোস্ট গার্ড স্টেশন কাগাদোবেকির একটি দল। অভিযানে ফাঁদ পেতে শিকার করা হরিণের প্রায় ১০০ কেজি মাংস এবং প্রায় চার হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার করা হয়। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকালে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. মুনতাসীর ইবনে মহসিন গণমাধ্যমকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার বিকাল চারটার দিকে অভিযান শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারি ও কৌশলগত অবস্থান নেওয়ার পর কোস্ট গার্ড সদস্যরা সন্দেহজনক কার্যকলাপ লক্ষ্য করেন। অভিযান চলাকালে পাচারকারীরা কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। ফলে কাউকে আটক করা সম্ভব না হলেও বিপুল পরিমাণ মাংস ও শিকারের ফাঁদ জব্দ করা হয়।

উদ্ধারকৃত হরিণের মাংস ও শিকারের ফাঁদ পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কাগাদোবেকি ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বন বিভাগ বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্তে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে জানা গেছে।

সুন্দরবন দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি অসংখ্য বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। বিশেষ করে চিত্রা হরিণ সুন্দরবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংরক্ষিত প্রাণী। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই একটি সংঘবদ্ধ চক্র অবৈধভাবে হরিণ শিকার করে মাংস পাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বন বিভাগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এসব চক্র গভীর বনে ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে এবং নদীপথ ব্যবহার করে মাংস শহর ও আশপাশের এলাকায় সরবরাহ করে থাকে।

স্থানীয়রা বলছেন, বনাঞ্চলের কিছু অসাধু লোক এবং পাচারচক্রের সদস্যরা বনের ভেতরের দুর্গম এলাকা সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখে। তারা রাতের আঁধারে ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে এবং সুযোগ বুঝে মাংস পাচার করে নেয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু আইনবিরোধী নয়, বরং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, হরিণ সুন্দরবনের খাদ্যচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হরিণের সংখ্যা কমে গেলে বাঘসহ অন্যান্য শিকারি প্রাণীর ওপরও এর প্রভাব পড়ে। ফলে পুরো বনব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই হরিণ শিকার ও পাচার বন্ধে কঠোর অভিযান এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিকল্প নেই।

কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. মুনতাসীর ইবনে মহসিন বলেন, বন্যপ্রাণী হত্যা ও পাচার রোধে কোস্ট গার্ড সর্বদা সতর্ক রয়েছে। সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

তিনি আরও বলেন, সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। এই বন রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। বন্যপ্রাণী পাচারের সঙ্গে জড়িতদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।

উল্লেখ্য, সুন্দরবনে হরিণ শিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী, হরিণ শিকার বা পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। তা সত্ত্বেও পাচারচক্র বিভিন্ন কৌশলে এই অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কোস্ট গার্ড, বন বিভাগ, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদার করা হলে এই অবৈধ কার্যক্রম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করাও জরুরি।

সব মিলিয়ে, সুন্দরবনে ১০০ কেজি হরিণের মাংস ও বিপুল পরিমাণ ফাঁদ উদ্ধারের ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে, বন্যপ্রাণী পাচার এখনো বড় ধরনের হুমকি। তবে কোস্ট গার্ডের সময়োপযোগী অভিযান এ ধরনের অপরাধ দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত