ইরান ছাড়তে নাগরিকদের নির্দেশ ফ্রান্স ও কানাডার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৬ বার
ইরান ছাড়তে নাগরিকদের নির্দেশ ফ্রান্স ও কানাডার

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের ক্রমাবনতিশীল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশটিতে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের দ্রুত ইরান ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে ফ্রান্স ও কানাডা। দুই দেশের সরকারই সতর্ক করে জানিয়েছে, চলমান অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং বিদেশিদের লক্ষ্য করে গ্রেপ্তার ও হয়রানির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। ফলে ইরানে অবস্থান বা ভ্রমণ এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কানাডা সরকার এক বিবৃতিতে জানায়, ইরানে বর্তমানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমননীতি। এসব কারণে যে কোনো সময় বিদেশি নাগরিকদের গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা চলাচলে বাধার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, নিরাপদ সুযোগ পাওয়া মাত্রই কানাডীয় নাগরিকদের ইরান ত্যাগ করা উচিত। একই সঙ্গে কানাডা স্বীকার করেছে, ইরানে তাদের কনস্যুলার সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত, যা সংকটকালে নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও প্রায় একই ধরনের সতর্কতা জারি করেছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা দিন দিন গভীর হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা ইরানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। এসব কারণে বিদেশি নাগরিকরা সহিংসতা, আকস্মিক নিরাপত্তা অভিযান বা প্রশাসনিক কড়াকড়ির শিকার হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

ফরাসি কর্তৃপক্ষ তাদের নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে, যেকোনো ধরনের বিক্ষোভ বা জনসমাবেশ এড়িয়ে চলতে এবং তেহরানে অবস্থিত ফরাসি দূতাবাসের নিয়মিত নির্দেশনা অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে কনস্যুলার সহায়তার সীমাবদ্ধতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্স ও কানাডার এই সতর্কবার্তা শুধু কূটনৈতিক সতর্কতার অংশ নয়, বরং এটি ইরানের ভেতরে পরিস্থিতি যে কতটা জটিল ও অস্থির হয়ে উঠেছে, তারই প্রতিফলন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানে অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক অসন্তোষের কারণে একের পর এক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এসব বিক্ষোভ অনেক ক্ষেত্রে সহিংস রূপ নিয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি ইরানের জনগণকে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, তাদের জন্য সহায়তা আসছে। তার এই মন্তব্য ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগকে আরও উসকে দিয়েছে।

ইরান সরকার বরাবরই অভিযোগ করে আসছে, দেশটির চলমান অস্থিরতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। তেহরানের দাবি, শুরুতে বিক্ষোভগুলো শান্তিপূর্ণ হলেও পরে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদেশি মদদপুষ্ট শক্তিগুলো এতে সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়। ইরানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতেই এসব তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো অবশ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। তাদের মতে, বিক্ষোভ দমনে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গ্রেপ্তার, আটক, যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিধিনিষেধ এবং ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ বিদেশিদের জন্যও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ফলে অনেক পশ্চিমা দেশই ধীরে ধীরে তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জোরদার করছে।

আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটও ইরানের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে উত্তেজনা, গাজা ও আশপাশের সংঘাত এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের অবস্থান—সব মিলিয়ে দেশটি আন্তর্জাতিক নজরদারির কেন্দ্রে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইরানের ভেতরে সামান্য অস্থিরতাও বড় ধরনের সংকটে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

ফ্রান্স ও কানাডার নাগরিকদের জন্য জারি করা এই সতর্কবার্তা অন্য দেশগুলোকেও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। অতীতে দেখা গেছে, একাধিক দেশ যখন একযোগে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে, তখন তা সাধারণত বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে।

ইরানে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের জন্য এটি এক কঠিন সময়। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কাজ, শিক্ষা বা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। হঠাৎ করে দেশ ছাড়ার নির্দেশ তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তবুও নিরাপত্তার প্রশ্নে অধিকাংশ দেশ ঝুঁকি নিতে রাজি নয়।

সব মিলিয়ে, ফ্রান্স ও কানাডার এই সিদ্ধান্ত ইরানের বর্তমান বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ—এই ত্রিমুখী সংকট ইরানকে এমন এক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমাধান এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত