সাবেক ডেপুটি গভর্নরের ১৫৯ হিসাব: সন্দেহের জালে কোটি কোটি টাকা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৯ বার
সাবেক ডেপুটি গভর্নরের ১৫৯ হিসাব: সন্দেহের জালে কোটি কোটি টাকা

প্রকাশ: ১৪  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে যখন প্রশ্ন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, ঠিক তখনই সামনে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সাবেক প্রভাবশালী কর্মকর্তার আর্থিক কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত বিস্ময়কর তথ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামানের নামে দেশের ১১টি ব্যাংকে ১৫৯টি ব্যাংক হিসাবের অস্তিত্ব এবং এসব হিসাবে মোট ৩৯ কোটি ১০ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) এসব লেনদেনকে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) বিস্তারিত তদন্তের সুপারিশ করেছে।

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব হিসাবের মধ্যে বিপুলসংখ্যক এফডিআর বা স্থায়ী আমানত হিসাব রয়েছে, যা একজন সাবেক ডেপুটি গভর্নরের জন্য অস্বাভাবিক। বর্তমানে এসব হিসাবে মোট স্থিতি রয়েছে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ টাকা। তবে লেনদেনের পরিমাণ ও অর্থের উৎস বিবেচনায় বিষয়টি শুধু অস্বাভাবিকই নয়, বরং গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগস্টে মনিরুজ্জামান ইসলামী ব্যাংকের গুলশান সার্কেল-১ শাখায় একটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলেন। এই হিসাব খোলার মাত্র দুই দিনের মাথায় তাঁর অ্যাকাউন্টে দুই কোটি টাকা জমা হয়। এই অর্থ আসে পে-অর্ডারের মাধ্যমে, যার উৎস ছিল এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের একটি হিসাব। বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে এই কারণে যে, মনিরুজ্জামান বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদ থেকে অবসর নেন ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর। অর্থাৎ চাকরি ছাড়ার প্রায় আট মাস পর এই বিপুল অঙ্কের অর্থ তাঁর হিসাবে জমা হয়।

বিএফআইইউ জানায়, ১৯ আগস্ট ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখা থেকে এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের হিসাবের বিপরীতে দুই কোটি টাকার পে-অর্ডার ইস্যু করা হয়। ২৩ আগস্ট গুলশান শাখা থেকে পে-অর্ডারটি ছাড় করা হয় এবং পরদিন, অর্থাৎ ২৪ আগস্ট, মনিরুজ্জামান ওই অর্থ দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের গুলশান সার্কেল-১ শাখায় তিনটি এফডিআর করেন—এর মধ্যে দুটি ৭০ লাখ টাকা করে এবং একটি ৬০ লাখ টাকার।

প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের হিসাব থেকে মনিরুজ্জামানের ব্যক্তিগত হিসাবে এই অর্থ কী কারণে এসেছে, সে বিষয়ে ব্যাংক নথিতে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ কারণেই লেনদেনটিকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওই হিসাব খোলার তিন মাস পর থেকে মনিরুজ্জামানের অ্যাকাউন্টে এস আলম গ্রুপের আরেকটি প্রতিষ্ঠান এসএস পাওয়ারের হিসাব থেকে নিয়মিত অর্থ জমা হতে থাকে। প্রায় ২৭ মাসে এই জমার পরিমাণ দাঁড়ায় এক কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে এক কোটি ৩৮ লাখ টাকা বেতন হিসেবে এবং ২৫ লাখ টাকা গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হিসেবে দেওয়া হয়েছে।

এই তথ্যের ভিত্তিতে বিএফআইইউ ধারণা করছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অবসরের পর মনিরুজ্জামান এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ারে যোগদান করেন। উল্লেখ্য, এসএস পাওয়ারের ৭০ শতাংশ মালিকানা এস আলম গ্রুপের হাতে এবং বাকি ৩০ শতাংশ দুটি চীনা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন।

মনিরুজ্জামানের ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড শুধু একটি ব্যাংকে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখায় ২০২৩ সালের মার্চ মাসে তাঁর নামে আরেকটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলা হয়। হিসাব খোলার দিনই সাত লাখ টাকা জমা হয় এবং একই দিনে ওই অর্থ দিয়ে একটি এফডিআর খোলা হয়। পরবর্তী সময়ে এই হিসাবেও বিপুল অঙ্কের লেনদেন হয়, যা তদন্তকারীদের কাছে সন্দেহজনক বলে বিবেচিত হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ এই প্রথম নয়। ২০১৬ সালেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে এবং সে সময় দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত শুরু করলেও তিনি ছাড়পত্র পান। এরপরই তিনি ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বর ডেপুটি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ এস আলম গ্রুপের হাতে চলে যায়। ওই সময় ইসলামী ব্যাংকে সরেজমিন পরিদর্শন বন্ধ রাখার বিষয়ে একটি বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়, যার সঙ্গে মনিরুজ্জামানের নাম জড়িয়ে আছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সে সময় তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগগুলোর দায়িত্বে ছিলেন, যা এই ঘটনাকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি অনিয়ম ও দুর্নীতি কমাতে ক্যাশলেস লেনদেন এবং ডিজিটাল ট্রান্সপারেন্সির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে, এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে এস এম মনিরুজ্জামান দাবি করেন, এস আলমের কাছে একটি বাড়ি বিক্রির বিপরীতে তিনি দুই কোটি টাকা পেয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে বাড়ি বিক্রির বিষয়ে আলোচনার একপর্যায়ে এস আলম বিষয়টি জানতে পারেন এবং বাড়িটি কিনে নেন। তবে বাড়ি বিক্রির সঙ্গে এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের হিসাব ব্যবহারের যৌক্তিক ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়ার বিষয়ে মনিরুজ্জামান বলেন, তিনি ‘কমার্শিয়াল অ্যাডভাইজার’ হিসেবে কাজ করেছেন এবং কোনো অনৈতিক সুবিধা নেননি। তাঁর নামে ১৫৯টি ব্যাংক হিসাব এবং ৩৯ কোটি টাকার বেশি লেনদেনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, তাঁর এতগুলো অ্যাকাউন্ট নেই, তবে বিভিন্ন সময়ে এফডিআর খুলেছেন এবং সবকিছুই তাঁর ট্যাক্স রিটার্নে দেখানো আছে।

তবে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার মতে, একজন সাবেক ডেপুটি গভর্নরের নামে এত বিপুলসংখ্যক হিসাব, এফডিআর এবং বড় অঙ্কের লেনদেন স্বাভাবিক নয় এবং এর পেছনে ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ কারণেই বিএফআইইউ বিষয়টি দুদকের কাছে পাঠিয়েছে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশের আর্থিক খাতে জবাবদিহি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা এবং অবসর-পরবর্তী নিয়োগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তদন্তের ফলাফল কী আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত