প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর—যাকে ঘিরে একসময় তৈরি হয়েছিল ব্যাপক প্রত্যাশা—আজ কার্যত স্থবির। প্রায় ছয় দশক পর ২০২৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হলেও বছর না ঘুরতেই বন্ধ হয়ে যায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম। একাধিকবার চালুর আশ্বাস মিলেছে, পরিদর্শন হয়েছে, পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে; কিন্তু বাস্তবতায় এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি এই সম্ভাবনাময় নৌবন্দর। ফলে স্বল্প খরচে পণ্য আমদানি, দ্রুত পরিবহন এবং সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে নতুন বাণিজ্যিক গতি সৃষ্টির যে সুযোগ ছিল, তা এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং অর্থনীতিবিদদের মতে, সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর পুরোপুরি চালু হলে রাজশাহীর অর্থনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে। শুধু আমদানি-রপ্তানি খাতেই নয়, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, শ্রমবাজার ও সেবা খাতেও সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান। কিন্তু অবকাঠামোগত প্রস্তুতির ঘাটতি, প্রশাসনিক অনুমোদনের জটিলতা এবং সমন্বয়ের অভাব বন্দরটির কার্যক্রমকে বারবার পিছিয়ে দিচ্ছে।
প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত না করেই ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর। উদ্বোধনের পর পরীক্ষামূলকভাবে ভারতের মুর্শিদাবাদের ময়া ঘাট রুট ব্যবহার করে কয়েক মাস পণ্য আমদানি করা হয়। ওই সময় নৌপথে পাথর, খাদ্যশস্যসহ কিছু পণ্য আনা হয়, যা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল। তবে খুব দ্রুতই প্রকট হয়ে ওঠে বাস্তব সীমাবদ্ধতা। পর্যাপ্ত সংযোগ সড়ক না থাকা, কাস্টমস ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার পূর্ণ প্রস্তুতি না থাকা এবং বন্দরের ভেতরের অবকাঠামো অসম্পূর্ণ থাকায় কার্যক্রম টেকসই হয়নি। অল্প সময়ের মধ্যেই বাণিজ্যিক চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সরেজমিনে সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, বন্দরের অফিস কক্ষ ও নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে আধুনিক বন্দর হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে ধরনের লজিস্টিক সুবিধা প্রয়োজন—যেমন পর্যাপ্ত গুদাম, পণ্য ওঠানামার যন্ত্রপাতি, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা ও কার্যকর সংযোগ সড়ক—তার বড় অংশই এখনো অসম্পূর্ণ। স্থানীয়রা বলছেন, উদ্বোধনের সময় যে ছবি দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে তার সঙ্গে বর্তমান অবস্থার মিল খুব কম।
গত বছর নৌপরিবহন উপদেষ্টা সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর পরিদর্শন করেন। ওই পরিদর্শনের পর বন্দরটি চালুর উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা এলেও বাস্তব অগ্রগতি খুব ধীর। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো বলছে, সংযোগ সড়ক নির্মাণসহ অবকাঠামোগত কাজ চলমান আছে। কিন্তু স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন, কবে নাগাদ এসব কাজ শেষ হবে এবং কবে তারা বাস্তবে এই বন্দর ব্যবহার করতে পারবেন—সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সময়সূচি নেই।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর চালু হলে রাজশাহী অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। তাঁর মতে, ভারতের মুর্শিদাবাদের ময়া ঘাট হয়ে পণ্য আমদানি করলে সড়কপথের তুলনায় অন্তত ৩০ শতাংশ খরচ কমবে। এতে স্থানীয় শিল্পকারখানা কাঁচামাল পাবে কম দামে, কৃষিপণ্য পরিবহনও হবে সহজ ও সাশ্রয়ী। পাশাপাশি পরিবহন খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, যা বেকারত্ব কমাতে সহায়ক হবে।
ভৌগোলিক দিক থেকেও সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুলতানগঞ্জ থেকে ভারতের মুর্শিদাবাদের ময়া বন্দরের দূরত্ব মাত্র ২০ কিলোমিটার। এই স্বল্প দূরত্বের নৌরুটটি কার্যকর হলে সীমান্তবর্তী দুই অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও সহজ হবে। তবে নৌপথের নাব্যতা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের রাজশাহী বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী জানান, বর্তমানে নৌপথে পানি থাকলেও বড় পরিসরে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রয়োজন। তাঁর মতে, মৌসুমি পরিবর্তনের কারণে পদ্মা নদীর নাব্যতা কমে গেলে বড় জাহাজ চলাচলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ড্রেজিং ছাড়া এই নৌপথকে পুরোপুরি কার্যকর রাখা কঠিন হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) কিছুটা ভিন্ন মত দিচ্ছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, পানির বর্তমান নাব্যতা অনুযায়ী সুলতানগঞ্জ-ময়া নৌপথে নৌযান চলাচলে আপাতত কোনো বড় প্রতিবন্ধকতা নেই। সুলতানগঞ্জ নদী বন্দরের সহকারী বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা দিনেশ কুমার সাহা জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুতই বন্দরটি চালু করা সম্ভব। তবে তিনি স্বীকার করেন, অন্যান্য চ্যানেলে নিয়মিত ও নিরাপদ নৌযান চলাচলের জন্য ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রয়োজন হবে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সুলতানগঞ্জ-ময়া নৌরুট কোনো নতুন ধারণা নয়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আগে সুলতানগঞ্জ-ময়া এবং গোদাগাড়ী-লালগোলা নৌঘাটের মধ্যে নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু ছিল। যুদ্ধের পর রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই রুট বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে রাজশাহী থেকে ভারতের ধূলিয়ান পর্যন্ত ৭৮ কিলোমিটার নৌপথ অনুমোদন পেলেও পদ্মার নাব্য সংকটের কারণে তা কার্যকর করা যায়নি। পরে অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত ও বাস্তবসম্মত পথ হিসেবে সুলতানগঞ্জ-ময়া রুট নির্ধারণ করা হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই নৌবন্দর শুধু রাজশাহীর জন্য নয়, বরং দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্যও একটি কৌশলগত সম্পদ হতে পারে। সড়কপথে পণ্য পরিবহনের চাপ কমবে, পরিবহন ব্যয় কমে আসবে এবং কার্বন নিঃসরণও তুলনামূলকভাবে কম হবে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য, সার, পাথর ও ভোগ্যপণ্যের আমদানি-রপ্তানিতে নৌপথ ব্যবহার হলে ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন।
তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর পুরোপুরি চালু করতে হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনুমোদনের পাশাপাশি সংযোগ সড়ক, কাস্টমস অবকাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নৌপথের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় ছাড়া এই কাজ এগোনো কঠিন।
স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা এখন একটাই—বারবার আশ্বাস নয়, বাস্তব কার্যক্রম। দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর যদি পুরোপুরি চালু করা যায়, তবে রাজশাহীর অর্থনীতিতে খুলে যেতে পারে বাণিজ্যের এক নতুন দুয়ার।