প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানুষের জীবনে এমন অনেক চাওয়া থাকে, যা বাস্তবতার নিরিখে প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। আর্থিক সংকট, পারিবারিক জটিলতা, দীর্ঘদিনের রোগ, চাকরি বা জীবিকার অনিশ্চয়তা, সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষা কিংবা মানসিক অশান্তি—এসব পরিস্থিতিতে মানুষ প্রায়ই হাল ছেড়ে দেয়। অথচ ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহর কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। শর্ত একটাই—চাওয়াটা হতে হবে বৈধ, আর সেই চাওয়ার সঙ্গে থাকতে হবে আন্তরিকতা, ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা।
ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলেমদের মতে, কিছু আমল আছে যেগুলো নিয়মিত ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করলে দুনিয়াতেই তার ফল চোখে পড়ার মতোভাবে প্রকাশ পায়। এসব আমলকে কেউ কেউ কারামত বলে থাকেন, আবার কেউ বলেন আল্লাহর বিশেষ রহমত ও বরকতের প্রকাশ। যারা মুজেজা বা কারামতকে কেবল অতীতের ঘটনা বলে মনে করেন, তাদের জন্যও এই আমলগুলো বাস্তব অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করতে পারে—ইনশাআল্লাহ।
এই আলোচনায় এমন দুটি আমলের কথা বলা হচ্ছে, যেগুলো বাহ্যিকভাবে খুব সাধারণ মনে হলেও মর্যাদায় অত্যন্ত উচ্চ। ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করার পাশাপাশি যদি কেউ এই দুই আমলে নিজেকে নিয়োজিত করেন, তবে তার জীবনে অচিন্তনীয় পরিবর্তন আসতে পারে বলে ইসলামি সূত্রগুলোতে বর্ণিত হয়েছে। এই দুটি আমল হলো দরুদ পাঠ এবং ইসতেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা।
দরুদ পাঠের গুরুত্ব ইসলামি শিক্ষায় অপরিসীম। আল্লাহ তায়ালা নিজেই কোরআনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। দরুদ এমন একটি আমল, যা আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি করে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত নাজিল করেন। দরুদের মাধ্যমে দোয়া কবুল হয়, গুনাহ মাফ হয় এবং অন্তরে প্রশান্তি নেমে আসে। বিশেষ করে দরুদে ইবরাহিম, যা আমরা নামাজে নিয়মিত পড়ে থাকি, তা সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন দরুদের অন্তর্ভুক্ত।
দরুদে ইবরাহিমে মূলত নবী মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর পরিবারবর্গের ওপর রহমত ও বরকতের দোয়া করা হয়, যেমনটি ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারকে দেওয়া হয়েছিল। এই দরুদ পাঠের মাধ্যমে একজন মুমিন নিজের জীবনে রহমত ও বরকতের প্রবাহ ডেকে আনেন। অনেক আলেম বলেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত দরুদ পাঠে অভ্যস্ত হয়, তার দোয়া আকাশে ওঠার আগেই কবুলের ব্যবস্থা হয়ে যায়। দুনিয়ার সংকট যেমন হালকা হয়ে আসে, তেমনি আখিরাতের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়।
ইসতেগফার হলো দ্বিতীয় সেই আমল, যা অসম্ভবকে সম্ভব করার পথে মুমিনের জন্য এক অদৃশ্য শক্তি হিসেবে কাজ করে। মানুষ মাত্রই ভুল করে, গুনাহে জড়িয়ে পড়ে—ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। ইসতেগফার সেই গুনাহ মোচনের চাবিকাঠি। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বারবার ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, তিনি তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।
ইসতেগফারের মাধ্যমে শুধু গুনাহই মাফ হয় না, বরং রিজিক বৃদ্ধি পায়, দুশ্চিন্তা দূর হয় এবং অজানা জায়গা থেকে কল্যাণের দরজা খুলে যায়—এমন প্রতিশ্রুতি কোরআন ও হাদিসে পাওয়া যায়। হজরত নুহ (আ.) তাঁর কওমকে ইসতেগফারের দাওয়াত দিয়ে বলেছিলেন, এতে আকাশ থেকে বৃষ্টি নেমে আসবে, ধন-সম্পদ ও সন্তান বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ ইসতেগফার শুধু আখিরাতের নয়, দুনিয়ার কল্যাণেরও মাধ্যম।
ইসলামি ঐতিহ্যে ইসতেগফারের বিভিন্ন দোয়া বর্ণিত হয়েছে। সহজ ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ থেকে শুরু করে ‘আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি’—এই ছোট ছোট বাক্যগুলো নিয়মিত পাঠ করলেও অন্তরে এক ধরনের হালকা ভাব অনুভূত হয়। আরও বিস্তৃত ইসতেগফার, যেমন ‘রব্বিগফিরলী ওয়াতুব আলাইয়া’ কিংবা সাইয়্যিদুল ইসতেগফার নামে পরিচিত দোয়াটি, বান্দার বিনয় ও আত্মসমর্পণের সর্বোচ্চ প্রকাশ। এতে বান্দা নিজের গুনাহ স্বীকার করে আল্লাহর রহমতের দরজায় দাঁড়ায়, আর আল্লাহ তায়ালা সেই দরজা কখনো বন্ধ করেন না।
আলেমরা বলেন, দরুদ ও ইসতেগফার একসঙ্গে নিয়মিত করলে তা যেন আত্মিক জীবনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ। দরুদ বান্দাকে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে যুক্ত করে, আর ইসতেগফার বান্দাকে তার রবের কাছে ফিরিয়ে নেয়। এই দুই আমলের মাধ্যমে অন্তর পরিষ্কার হয়, নিয়ত শুদ্ধ হয় এবং জীবনের জট খুলতে শুরু করে। অনেকেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বলেন, দীর্ঘদিনের আটকে থাকা কাজ, অসম্ভব মনে হওয়া চাওয়া—এসবই ধীরে ধীরে সহজ হয়ে এসেছে এই দুই আমলের বরকতে।
তবে ইসলামি শিক্ষায় একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—এই আমলগুলো কোনো যাদু বা তাবিজ নয়। এগুলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার মাধ্যম। ফরজ ইবাদত, হালাল-হারামের প্রতি সচেতনতা এবং মানুষের হক আদায়ের চেষ্টা ছাড়া শুধু আমল করলেই ফল মিলবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং ফরজ পালনের ভিত্তির ওপর দরুদ ও ইসতেগফার যুক্ত হলে তবেই তা পূর্ণতা পায়।
আজকের ব্যস্ত ও অস্থির জীবনে এই দুটি আমল পালন করা খুব কঠিন কিছু নয়। হাঁটতে হাঁটতে, কাজের ফাঁকে, নামাজের পর কিংবা ঘুমানোর আগে—যেকোনো সময় দরুদ ও ইসতেগফার পড়া যায়। নিয়মিত অল্প হলেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যারা জীবনে বৈধ কোনো চাওয়া নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন, যারা মনে করছেন সব দরজা বন্ধ—তাদের জন্য এই দুই আমল হতে পারে আশার আলো। আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রেখে দরুদ ও ইসতেগফারকে সঙ্গী করলে, অসম্ভবও যে সম্ভব হয়ে ওঠে—তা হয়তো নিজের জীবনেই একদিন স্পষ্ট হয়ে ধরা দেবে।