সর্বশেষ :
গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে রুদ্ধদ্বার বৈঠকেও দূরত্ব ঘোচেনি ড্রোন অনুপ্রবেশে দোষীদের শাস্তির অঙ্গীকার দক্ষিণ কোরিয়ার ২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রকে বহিষ্কারের দাবি ব্রিটিশ এমপিদের বিবাহবার্ষিকীতে ডিভোর্স পেপার, সেলিনার জীবনের কঠিন সত্য উত্তেজনার মধ্যে ইরানের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ হাদীর বিচার চাই: ইনকিলাব মঞ্চ নিয়ে স্ত্রীর প্রশ্ন ছয় মাসে এডিপি বাস্তবায়নে ধস, উন্নয়ন গতি পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন রংপুরের ছয় আসনে ভোটের লড়াই, শক্ত অবস্থানে জামায়াত যুব বিশ্বকাপে আজ পর্দা উঠছে, শুরুতেই ভারতের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ হয়েছে, দাবি ট্রাম্পের

জামায়াতের জোটে চরমোনাই পীর–মামুনুল হক, অনিশ্চয়তার মেঘ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪১ বার
জামায়াতের জোটে চরমোনাই পীর–মামুনুল হক, অনিশ্চয়তার মেঘ

প্রকাশ: ১৪  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আগামী দ্বাদশ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গড়ে ওঠা বৃহৎ জোট এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত এই জোটে চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং আল্লামা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থাকবে কি না—তা নিয়ে দেখা দিয়েছে স্পষ্ট অনিশ্চয়তা। আসন বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ, পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তে একক ভূমিকার অভিযোগ—সব মিলিয়ে জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

জোটসংশ্লিষ্ট দলীয় সূত্র ও সরেজমিন তথ্যে জানা যায়, গত মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে দলটির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের বহু নেতা রামপুরার একটি মাদ্রাসায় সমবেত হন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গাড়ি নিয়ে নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত হন। মাগরিবের নামাজের পর শুরু হয় ইসলামী আন্দোলনের শুরা কাউন্সিলের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক। বৈঠকে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের কথা উঠে আসে।

রাত সাড়ে দশটার দিকে মাদ্রাসাটির আটতলা ভবনের নিচতলায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন নেতা-কর্মী পাহারায় রয়েছেন, যেন বাইরের কেউ বৈঠকস্থলে প্রবেশ করতে না পারে। এশার নামাজের বিরতির পর আবার বৈঠক শুরু হয়। রাত গভীর হওয়ার পরও নিচে ছোট ছোট দলে নেতাকর্মীদের জটলা করে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যায়। কেউ কেউ আবার রাত পৌনে বারোটার দিকেও গাড়ি নিয়ে বৈঠকে যোগ দেন। শেষ পর্যন্ত রাত একটার পরে বৈঠক শেষ হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শুরু থেকেই শতাধিক আসনে নির্বাচন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। তবে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে তারা তাদের দাবিতে ছাড় দেয়। এক পর্যায়ে তাদের দাবি নেমে আসে ৫০টির বেশি আসনে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী সর্বোচ্চ ৪০টি আসন ছাড় দিতে রাজি হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়। ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতা এই প্রস্তাবকে অসম্মানজনক ও বাস্তবতা-বিবর্জিত বলে মনে করছেন। তাদের যুক্তি, মাঠপর্যায়ে দলটির সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটব্যাংকের তুলনায় এই আসন সংখ্যা খুবই কম।

ইসলামী আন্দোলনের একাধিক নেতা মনে করেন, গণ–অভ্যুত্থানের পর ‘ওয়ান বক্স’ নীতির মাধ্যমে সমঝোতাভিত্তিক নির্বাচনের যে ধারণা সামনে আনা হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে একপাক্ষিক সিদ্ধান্তে রূপ নিয়েছে। শুরুতে পাঁচটি ইসলামী দল এই আলোচনায় যুক্ত থাকলেও পরে জামায়াত এতে যোগ দেয়। এরপর জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) আলোচনায় আসে। তবে অভিযোগ উঠেছে, এই সমঝোতার মধ্যেই জামায়াত আলাদাভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং আমার বাংলাদেশ পার্টির সঙ্গে বৈঠক করেছে, যা অন্য শরিক দলগুলোকে না জানিয়েই করা হয়েছে। বিষয়টিকে ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতা আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।

এ ছাড়া জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাক্ষাৎ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে ইসলামী আন্দোলনের ভেতরে। দলটির নেতাদের একটি অংশ মনে করছেন, একদিকে ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলা, অন্যদিকে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার বার্তা দেওয়া—এই দ্বৈত কৌশল প্রশ্নবিদ্ধ। তারা এটিকে রাজনৈতিক দ্বিচারিতা হিসেবেও দেখছেন।

গতকাল মধ্যরাতে শুরা কাউন্সিলের বৈঠক শেষ হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় বিষয়টি ইসলামী আন্দোলনের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম মজলিসে আমেলার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার এই ফোরামের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা জানিয়েছেন, ওই বৈঠকের পরই চরমোনাই পীরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আসন সমঝোতায় থাকা না থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ইসলামী আন্দোলনের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শেষ কথা বলবেন দলের আমির। তিনি চাইলে সব সুপারিশ উপেক্ষা করেও সমঝোতায় থাকতে পারেন, আবার না চাইলে পুরো জোটের সমীকরণই বদলে যেতে পারে।

অন্যদিকে আল্লামা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও আসন বণ্টন নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। দলটি ২৫ থেকে ৩০টি আসন দাবি করলেও জামায়াত সর্বোচ্চ ২০টি আসনে ছাড় দিতে পারে বলে জানিয়েছে। এ অবস্থায় খেলাফত মজলিস চাইছে, যেসব আসনে সমঝোতা হবে না, সেগুলো উন্মুক্ত রাখা হোক। মঙ্গলবার জামায়াতের সঙ্গে বৈঠকের পর মামুনুল হক বলেন, আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে, তবে কিছু আসনে সমঝোতা না হলে সেগুলো উন্মুক্ত রাখার বিষয়েও ঐকমত্য থাকতে হবে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে গেলে তাদের দলকেও জোটে থাকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তার ভাষায়, ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াতের টানাপোড়েন বাড়লে পুরো জোটের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।

জামায়াতের নেতারা অবশ্য এখনো আশাবাদী। তাদের দাবি, শেষ মুহূর্তে হলেও সব দলকে নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে। আজ বিকেলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ১১ দলের আসন সমঝোতা বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার জন্য সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়েছে। সেখানে জোটভুক্ত সব দলের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিত থাকার কথা জানানো হয়েছে। তবে সকাল পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের অবস্থান পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়ায় এই ঘোষণার বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন থাকছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী দলগুলোর এই জোট ভেঙে গেলে তার প্রভাব পড়বে নির্বাচনী সমীকরণে। একদিকে ভোট বিভাজনের ঝুঁকি বাড়বে, অন্যদিকে ইসলামী ভোটব্যাংক ছড়িয়ে পড়বে একাধিক প্রার্থীর মধ্যে। আবার জোট অটুট থাকলেও আসন বণ্টনে অসন্তোষ রয়ে গেলে মাঠপর্যায়ে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ইসলামী জোট এখন একটি সংকটময় সময় পার করছে। চরমোনাই পীর ও মামুনুল হকের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছে পুরো রাজনৈতিক অঙ্গন। তাদের অবস্থানই নির্ধারণ করবে, এই জোট ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে নির্বাচনে যাবে, নাকি ভাঙনের পথে হাঁটবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত