গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের নজর, কংগ্রেসে অধিগ্রহণ প্রস্তাব

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২৪ বার
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের নজর, কংগ্রেসে অধিগ্রহণ প্রস্তাব

প্রকাশ:  ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ডেনমার্কের মালিকানাধীন স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়েছে। এবার সরাসরি মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি ইস্যু আবারও বৈশ্বিক কূটনৈতিক অঙ্গনে সামনে চলে এসেছে। যদিও গ্রিনল্যান্ড প্রশাসন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, ডেনমার্ক ও ন্যাটোর কাঠামোর বাইরে কোনো সমাধান তারা মেনে নেবে না।

গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহ নতুন নয়। তাঁর প্রথম মেয়াদ থেকেই তিনি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপটিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার কথা বলে আসছেন। আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ডের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব, খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা এবং সামরিক কৌশলগত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত—এমন যুক্তি তুলে ধরে ট্রাম্প প্রশাসন অতীতেও দ্বীপটি কেনার প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই প্রস্তাব তখন ডেনমার্ক ‘অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করে।

নতুন করে উত্তেজনার সূত্রপাত হয় ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে, যেখানে তিনি গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়টি ‘জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজন’ হিসেবে তুলে ধরেন। শুধু কথার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। মার্কিন সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখতে নির্দেশ দেওয়ার খবরও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও গভীর হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটেই স্থানীয় সময় সোমবার, ১২ জানুয়ারি, মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার একটি প্রস্তাবিত বিল উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে ট্রাম্প প্রশাসন যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে পারবে। যদিও বিলটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবু এর প্রতীকী ও রাজনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গ্রিনল্যান্ড প্রশাসন এই প্রস্তাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের ভাষ্য, গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ এবং দ্বীপটির প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ন্যাটোর কাঠামোর মধ্যেই নিশ্চিত করা হবে। গ্রিনল্যান্ড সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা পরিষ্কার করে জানিয়েছেন, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র অধিকার সেখানকার জনগণের। কোনো বিদেশি শক্তির হুমকি কিংবা চাপের কাছে তারা নতি স্বীকার করবে না।

ডেনমার্কও যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের তীব্র বিরোধিতা করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, জোরপূর্বক গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা করা হলে তা শুধু ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব নয়, বরং পুরো ন্যাটো জোটের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে। কারণ ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশই ন্যাটোর সদস্য। এক সদস্য রাষ্ট্র যদি আরেক সদস্যের ভূখণ্ড দখলের হুমকি দেয়, তাহলে জোটের পারস্পরিক আস্থা ও সমষ্টিগত নিরাপত্তা নীতির ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারাও এই বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থানকে সমর্থন করেননি। ইউরোপীয় কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্রিনল্যান্ড যদি বাড়তি সহায়তা চায়, তাহলে ডেনমার্কের মাধ্যমে সে সহায়তা জোরদার করা হবে। আর্কটিক অঞ্চলে নৌ উপস্থিতি বাড়ানো, আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা এবং ড্রোন প্রতিরোধ সক্ষমতা উন্নয়নের কথাও আলোচনায় এসেছে। ইউরোপীয় নেতাদের মতে, আর্কটিক অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা শুধু ইউরোপ নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এই উত্তেজনার মধ্যেই কূটনৈতিক উদ্যোগও জোরদার হয়েছে। আজ বুধবার, ১৪ জানুয়ারি, হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠকে বসছেন ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, এই বৈঠকে গ্রিনল্যান্ডের বর্তমান অবস্থান, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন জানিয়েছেন, তিনি গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎজফেল্ডটকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নিজেই বৈঠকে অংশগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং আলোচনার আয়োজন করেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই বৈঠক উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এদিকে ডেনমার্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ট্রোলস লুন্ড পউলসেন ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন। ওই বৈঠকেও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। ন্যাটো মহলের ধারণা, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রহ শুধু ভূখণ্ড দখলের বিষয় নয়, বরং আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব মোকাবিলার একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্কটিক অঞ্চলে নতুন নৌপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা বাড়ছে, যা বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে তীব্র করছে। এই প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ড হয়ে উঠেছে ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু।

তবে বাস্তবতা হলো, গ্রিনল্যান্ডের জনগণ ও প্রশাসন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে চায়। আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যাটোর কাঠামোর মধ্যে থেকেই তারা নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার পক্ষে। ফলে কংগ্রেসে প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও, সেটি বাস্তব রূপ পাবে কি না—তা নিয়ে এখনো বড় ধরনের সংশয় রয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে গ্রিনল্যান্ড ইস্যু এখন আর কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়। এটি ন্যাটোর ঐক্য, ইউরোপীয় নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে। সামনের দিনগুলোতে এই ইস্যু কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক মহল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত