গুনাহে হারায় ইবাদতের স্বাদ, আত্মার পরিশুদ্ধি জরুরি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৭ বার
গুনাহে হারায় ইবাদতের স্বাদ, আত্মার পরিশুদ্ধি জরুরি

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানুষের আত্মার পরিশুদ্ধি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “নিশ্চয়ই সে সফল হয়েছে, যে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর নিশ্চয়ই সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তাকে কলুষিত করেছে।” (সুরা আশ-শামস, আয়াত ৯-১০)। এই আয়াতের তাফসিরে ইবনে কাসির (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন যে, যিনি নিজের আত্মাকে ঈমান ও আনুগত্যের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ করেছেন, তিনি সত্যিকারভাবে সফল হয়েছেন এবং জান্নাতের নিয়ামতে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হয়েছেন। অপরদিকে, যে ব্যক্তি নিজের নফসকে অবহেলায় ফেলে গুনাহে লিপ্ত হয়েছে, সে ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্যর্থ। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া যিনি পাপাচারে লিপ্ত, তাকে ধ্বংস ও লাঞ্ছনা ঘিরে রাখে।

মহানবী (সা.) নিজের জীবনে নিয়মিত দোয়া করতেন, যেখানে তিনি বলেন, “হে আল্লাহ! আমার আত্মাকে তাকওয়া দান করুন এবং তাকে পরিশুদ্ধ করুন; আপনিই সর্বশ্রেষ্ঠ পরিশুদ্ধকারী। আপনিই তার অভিভাবক ও সাহায্যকারী।” (মুসলিম, হাদিস ২৭২২; নাসাঈ, হাদিস ৫৪৫৮)। এটিই নির্দেশ করে যে, মানুষের জন্য সর্বোত্তম কাজ হলো নফসকে পরিশুদ্ধ করার জন্য সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখা।

ইবনে কুদামা মাকদিসি (রহ.) নিজের দোষ জানা ও আত্মপরিশোধের চারটি পথ উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, এমন একজন আলেম বা অভিজ্ঞ শাইখের কাছে বসা, যিনি নফসের রোগ ও তার চিকিৎসা জানেন। দ্বিতীয়ত, একজন সৎ ও দ্বিনদার বন্ধুকে নফসের তত্ত্বাবধায়ক বানানো, যিনি নিয়মিত দোষ স্মরণ করাতে পারেন। তৃতীয়ত, শত্রুর মন্তব্য থেকেও নিজের দোষ শেখা; কারণ সমালোচক অনেক সময় সত্যিকার শিক্ষাদান করেন। চতুর্থত, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করা, যাতে অন্যদের মধ্যে যে আচরণ নিন্দনীয় মনে হয়, তা নিজে পরিহার করা যায়। এই চারটি পথ মানুষের আত্মশুদ্ধির জন্য অপরিহার্য।

আত্মসংস্কারের চারটি স্তরও গুরুত্বপূর্ণ। হৃদয়ের সংশোধন হল প্রথম ধাপ। নবী করিম (সা.) বলেছেন, শরীরে একটি মাংসপিণ্ড আছে যা ঠিক থাকলে পুরো শরীর ঠিক থাকে, আর তা নষ্ট হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়; সেটি হলো হৃদয়। দ্বিতীয় ধাপ হলো আচরণের সংশোধন। আচরণ একজন মুসলিমের দ্বিনদারির পরিচয় বহন করে। আল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি রবের সামনে দাঁড়িয়ে ভয় রাখে এবং নফসকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখে, জান্নাতই তার ঠিকানা। তৃতীয় ধাপ হলো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে প্রস্তুত করা, যাতে হৃদয় ও আচরণের পরিশোধন কার্যকরভাবে শরীরেও প্রতিফলিত হয়। চতুর্থ ও শেষ ধাপ হলো সমাজে ভূমিকা পালনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। মুসলিম ব্যক্তি উদ্দেশ্যহীনভাবে জীবনযাপন করেন না; বরং সমাজে সৎকর্ম ও দায়িত্ব পালনই তার জীবনের লক্ষ্য।

গুনাহ ত্যাগের মধুর স্বাদও রয়েছে। ড. মুস্তাফা সাবাঈ উল্লেখ করেন, যখন নফস গুনাহ করতে চায়, তখন আল্লাহর কথা স্মরণ করানো উচিত। এতে নফস যদি থামে, তা হলো সাফল্য; না হলে নফস পশুর মতো হয়ে যায়। গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার ফলে হৃদয়ে নূর ও প্রশান্তি প্রবাহিত হয়, যা কোনো গুনাহের আনন্দের সঙ্গে তুলনীয় নয়। সুরা ইউসুফে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই নফস মানুষকে মন্দের দিকে টানে।” তাই আল্লাহর অবাধ্যতা করে বরকত আশা করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

গুনাহের সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো ইবাদতের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হওয়া। ইবনে জাওজি (রহ.) বর্ণনা করেছেন, বনি ইসরাঈলের পাদ্রি এক বান্দাকে বলেছিলেন, “তুমি কি জানো, আমি তোমাকে আমার সঙ্গে কথোপকথনের মাধুর্য থেকে বঞ্চিত করেছি?” অর্থাৎ গুনাহ মানুষের হৃদয়কে আল্লাহর নূর ও ইবাদতের আনন্দ থেকে দূরে রাখে।

অতএব, মুসলিম ভাই ও বোনদের জন্য জরুরি, নিজের নফসকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা চালানো। আত্মশুদ্ধি, সৎ আচরণ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিয়ন্ত্রণ এবং সমাজে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে একটি মুসলিম ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সফল হতে পারে। মহান আল্লাহর দয়া ও রহমতের মাধ্যমে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা সম্ভব, এবং এটি ইবাদতের আস্বাদ ফিরে পাওয়ার একমাত্র পথ।

শেষে মুসলিম ভাইদের জন্য প্রার্থনা, “হে আল্লাহ! আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করুন, আমাদের গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনুন, আমাদের অন্তরকে আপনার নূরে ভরিয়ে দিন এবং আমাদের ইবাদতের আস্বাদ দান করুন। আপনি তো বিপন্নের ডাকে সাড়া দেন।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত